এইডস,সমকামী
এইডস ও সমকামী রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।   ছবি: সংগৃহীত


দেশে বাড়ছে এইচআইভি (হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশ সমকামী। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো সতর্কতা, নেই পর্যাপ্ত ল্যাব ও কিটও। 

যদিও এইডস সচেতনতা বাড়াতে পহেলা ডিসেম্বর এইডস দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে এইডস মুক্ত করা।

রাজধানীতে এক যুবক এলার্জি পরিক্ষা করতে যেয়ে এইডস শনাক্ত হয়। তিনি জানান, সমকামিতায় জড়িয়ে যাওয়ায় এমন পরিণতি। ঐ যুবক বলেন ‘এই ভুল পথে না যেতে সবাইকে অনুরোধ করবো। একটা ভুলের জন্য সারজীবন পস্তাতে হয়। আমি চাই না, আমার মতো কেউ এভাবে পস্তাক।’ চিকিৎসকরাও একই কথা বলছেন। ড. এ আর সাখাওয়াত হোসেন জানান, বর্তমানে আক্রান্তদের প্রায় ৪০ শতাংশই সমকামী। বাকি ৪০ শতাংশের মতো বিদেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে আসে। এ ছাড়া ব্ল্যাড, ইনজেক্টেবল ড্রাগ শেয়ার বা এ জাতীয় বিভিন্নভাবে কিছু লোক আক্রান্ত হন।

দেশে একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র ঢাকা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ২০২৫ সালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩০০ এইচআইভি রোগী। পর্যাপ্ত জনবল ও কিট সংকটের কারনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রুগীরা। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ড. আরিফুল বাসার জানান, ‘আমাদের এখানে যারা আসেন, তারা খুব খারাপ পর্যায়ে এসে ভর্তি হন। এখানে আসা রোগীদের এইচআইভি ছাড়াও অন্যান্য রোগ থাকে। এগুলোর জন্য যে ধরনের ল্যাবের সাপোর্ট দরকার, সেটা আমরা তাদেরকে দিতে পারি না।’

পরিসংখ্যান যা বলছে:

এইডস বা এসটিডি কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আক্রান্ত্রে সংখ্যা ছিলো ১ হাজার ২৭৬ জন এবং মারা গেছেন ২৬৬ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৩৮ জন এবং মারা গেছেন ১৯৫ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ধারণা করা হয় দেড় হাজারে দাড়াবে কিন্তু এই সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৮৯১ জন হয়েছে, মারা গেছেন ২১৯ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত এইডস আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ৪২ শতাংশ অবিবাহিত তরুণ-তরুণী। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তরুণ-তরুণীদের আক্রান্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। গেল বছর ৫০ জনের বেশী মানুষ আক্রান্ত হয়েছে যশোরে। যশোরের সিভিল সার্জন মো: মাসুদ রানার ভাষ্যমতে, আক্রান্তদের মধ্যে বেশীর ভাগই স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থী। এই বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা কম; কিন্তু কৌতূহল বেশী। কৌতূহল তেকেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শরু হয়। এদের মধ্যে সমকামী তরুণদের সংখ্যা বেশী। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জে ৩৮ জন ও কক্সবাজারে ২২০ জন নতুন আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।

ঝুঁকি বাড়ার কারণ:

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধিতে একসঙ্গে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। ইনজেক্টেবল ড্রাগের ব্যবহার। একই সুচ একাধিকজন ব্যবহার করে, ফলে রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ। কন্ডম ব্যবহার না করা, সঙ্গীর যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত না থাকা, একাধিন সঙ্গী থাকা। ধারণা করা হচ্ছে যে, এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পিছনে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে নিরবতাও কাজ করছে। কারণ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনতা ও যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে সঠিক শিক্ষা এবং নৈতিকতা ও সতর্কতার অভাব।

সমকামীতায় এইডসের ঝুঁকি, সম্ভাবনা ও বাস্তবতা:

বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্তদের ৪০ শতাংশ সমকামী। স্বেচ্ছাচারিতা, অসতর্ক যৌন আচরণ এবং অজ্ঞতার কারণে সমকামীদের মাধ্যমে সংক্রমণ বাড়ছে এবং সংক্রমিত হচ্ছে। আমেরিকার সরকারি সংস্থা, সেন্ট্রারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশী এইচআইভি আক্রান্ত সমকমীরা। 

২০২২ সালে নতুন এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে ৬৭ শতাশই সমকামী এবং বাইসেক্সুয়াল। বাংলাদেশে আক্রান্তের মধ্যে ৪০ শতাংশ সমকামী এবং এই হার বেড়েই চলেছে। এদের মধ্যে অনেকে এইচআইভি পরিক্ষা করায় না। ফলে অগচরে রয়ে যায় বহু আক্রান্ত ব্যাক্তি। বাংলাদেশ পিনাল কোড ১৮৬০ এর ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামীতা দন্ডনীয় অপরাধ। যার সাজা ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:

এইডস নিরাময়যোগ্য নয়। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণভাবে জীবনযাপন করতে পারে এবং অন্যের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। এক সঙ্গে থাকলে খাবার খেলে এইডস ছড়ায় না।

বিষেশজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের ঝুঁকিতে যারা আছেন প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস (পিআরপিই) তাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ হারে কমিয়ে আনে। অপর একটি চিকিৎসা হলো পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস (পিইপি) এটিও অনেক কার্যকরী। পিইপি মূলত যদি কোন সুস্থ ব্যাক্তি আক্রান্ত হওয়ার মতো কোন ভুল করে ফেলে ও  ৭২ ঘন্টার মধ্যে যদি পিইপি চিকিৎসা গ্রহণ করে তাহলে প্রায় ৮০ শতাংশ ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে।

শিক্ষা ও কার্যক্রম:

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এইচআইভি বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। এই বয়সটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই ঝুঁকি কমাতে স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান কতটা হচ্ছে তার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এইচআইভি সংক্রমণ রোধে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, সে কাজ কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ ও  খোঁজ-খবর সরকারের স্বস্থ্যমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ:

কোন ধর্ম-ই সমকামীতা, পরকীয়া ও বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্ক সমর্থন করে না। ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু ধর্মে এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআন ও হাদিসে এর জন্য কঠিনতম শাস্তির কথা বলা হয়েছে। নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশাসন না মেনে চলা একটি বড় কারণ। যদিও এখন তরুণদের মধ্যে ধর্মের প্রতি জানার আগ্রহ, যাচাই করার আগ্রহ এবং মানার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।