ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে যে সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তাদের সামনে অপেক্ষা করছে বহুমাত্রিক ও জটিল চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, তরুণদের কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক সমঝোতা, উগ্রপন্থা মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকট সব মিলিয়ে আগামী বছরগুলো নতুন সরকারের জন্য হবে কঠিন পরীক্ষার সময়। ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টমাস কিন রচিত নিবন্ধটি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ঘণ্টা: ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন’ শীর্ষক এই নিবন্ধে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নিবন্ধের শেষ প্রশ্নে পরবর্তী সরকারের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে, নতুন সরকারকে প্রথমেই মোকাবিলা করতে হবে দীর্ঘদিনের দুর্বল ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের কাজ। একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরশীল একটি মন্থর অর্থনীতি, বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবের মুখোমুখি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে জটিল ও সংবেদনশীল সম্পর্ক সামাল দেয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং মিয়ানমার সীমান্তের কাছে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাও বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিযবুত তাহরীরসহ কয়েকটি কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ। সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতা। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বয়স ৩০ বছরের নিচে। উচ্চশিক্ষিত এই তরুণদের বড় একটি অংশ নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে। শুধু কর্মসংস্থান নয়, তারা দেশ পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং উন্নয়নের সুফল সবার মধ্যে সুষমভাবে বণ্টনের প্রত্যাশা করে। ‘জুলাই সনদ’সহ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গড়িমসি হলে তরুণদের মধ্যে এই ধারণা জন্ম নিতে পারে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল কেবল লোক দেখানো।
রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নটিও নতুন সরকারের জন্য একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাস ও বড় ভোটব্যাংকের কারণে আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। তবে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় দলটিকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর শর্তাবলি নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে উঠলে সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে এর জন্য দলটির নেতৃত্বকে ২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে, যা শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত করতে অস্বীকার করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যস্থতার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর মেয়াদি একটি নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের তুলনায় রাজনৈতিক বিরোধ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তবে দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের পরিমাণও হবে অনেক বেশি। এ কারণে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর উচিত বাংলাদেশের এই রূপান্তরপর্বে নতুন সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া।
সংস্কারের অগ্রগতি প্রসঙ্গে টমাস কিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উঠে এসেছে ‘জুলাই সনদ’, যেখানে সংবিধানসহ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে সই করেছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তবে পুলিশ ও নিরাপত্তা খাত সংস্কারে তেমন অগ্রগতি হয়নি। মব সহিংসতা ও বিচারহীনতা জনমনে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। নির্বাচনের দিন সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সব সংস্কার বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।
নিবন্ধের শুরুতে বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। গত ১৫ বছরে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারই প্রথম বড়সংখ্যক ভোটার একটি তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোটে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দল সম্পর্কে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর বিএনপি নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়েছে। অন্যদিকে তরুণদের সমর্থন ও এনসিপির সঙ্গে জোট গড়ে জামায়াত শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ভোটাররা প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির বাইরে বিকল্প খুঁজছেন, আর এই দুই জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ওপরই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে বলে মনে করছে ক্রাইসিস গ্রুপ।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!