নির্বাচন
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তাঁর দমন–পীড়নমূলক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেটে গেছে ১৮ মাস। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফেরার কথা। দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে এখন পর্যন্ত সৌভাগ্যবশত সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এই নির্বাচন মূলত দুটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিচ্ছে। আগের শাসনামলে উভয় দলই নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। একটি হলো জামায়াতে ইসলামী—বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি দল হিসেবে বিবেচিত। অন্যটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির দীর্ঘদিনের নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ছেলে তারেক রহমান দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে বিএনপিই।

হতাশার মধ্যেও অর্জন উদ্‌যাপনের সুযোগ

দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, অভ্যুত্থানের পর সাহসী নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে নতুন দলগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি—এ নিয়ে হতাশা রয়েছে অনেকের। শেখ হাসিনার শাসন নিন্দনীয় হলেও তার আগের সময়ের রাজনীতিও খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না।

প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে, যেসব ইসলামপন্থি দল এবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে, তারা সহনশীলতার যে বার্তা দিচ্ছে, বাস্তবে তা কতটা রক্ষা করবে—সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির আগের শাসনামলগুলোও দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কিত ছিল।

তবে দুই বছর আগের বাংলাদেশের করুণ পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান অবস্থার তুলনা করলে দেশের অগ্রগতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে দ্য ইকোনমিস্ট। অন্তর্বর্তী সরকার শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে—এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে। এসব অর্জন উদ্‌যাপনের যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়

এই নির্বাচন বিপ্লবকে নিয়ে যাবে নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ এক পর্যায়ে। পুরোনো রাজনৈতিক ধারা ফিরে এলে বিদেশি মিত্রদের সমর্থন কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনীতিকেরা পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও করা হয়েছে। সংস্কারের গতি ধরে রাখতে না পারলে অগ্রগতি থমকে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অর্থনীতি। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করলেও এখন প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। চলতি বছর বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে, ফলে বাণিজ্য সুবিধা ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ কমে আসবে।

শিল্পকারখানার দক্ষতা বাড়ানো, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি—যা বর্তমানে জিডিপির মাত্র সাত শতাংশ—এবং অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। একই সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককেও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে দিল্লির দীর্ঘদিনের সমর্থন এবং বাংলাদেশকে হিন্দুবিদ্বেষে আক্রান্ত দেশ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো কখনো ভারতের প্রতি অপ্রয়োজনীয় কড়া অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী সরকারকে এই সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে হবে।

সবশেষে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক নবায়ন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের দিন সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে একটি গণভোট হবে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি কমানো। নাগরিকদের এসব সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং পরবর্তী সরকারের তা বাস্তবায়ন করা জরুরি—যদিও তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রলোভন থাকবে।

একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেই দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নও সামনে আসবে। বিষয়টি কঠিন হলেও নতুন বাংলাদেশকে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষমার ভিত্তিতেও দাঁড় করাতে হবে বলে মন্তব্য করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।

প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশিরা তাঁদের বিপ্লব নিয়ে গর্ব করতেই পারেন—যে বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ‘জেন জি’ আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে। আসন্ন নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার কঠিন কাজটি আসলে এখনই শুরু।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট