যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বিপর্যয়, ভোগান্তি-অনিশ্চয়তায় হাজারো যাত্রী
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বিপর্যয়, ভোগান্তি-অনিশ্চয়তায় হাজারো যাত্রী।   ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৃষ্টি হয়েছে চরম স্থবিরতা। একের পর এক ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কয়েক হাজার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও ওমরাহ যাত্রী। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তথ্য সংকটে যাত্রীদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে বিমানবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ টার্মিনালের সামনে এবং বিপরীত পাশের ফুটপাথে দিশেহারা হয়ে বসে আছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও গন্তব্যহীন এসব মানুষ নড়তে চাইছেন না।

ফরিদপুর থেকে আসা সৌদি আরবগামী যাত্রী মো. রুবেল জানান, একই গন্তব্যের সৌদিয়া এয়ারলাইন্স যাত্রী নিলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হচ্ছে না। বিমান প্রদত্ত হটলাইন নম্বরটি (১৩৬৩৬) রাত ৮টার পর থেকে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফ্লাইটের তথ্য না পেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ফুটপাথে অপেক্ষা করছেন তিনি।

একই অভিজ্ঞতা আব্দুল জলিল নামে এক প্রবাসীর, যিনি গত ২৩ বছর ধরে সৌদি আরবে আছেন। তিনি জানান, ইমিগ্রেশন শেষ করে বিমানে ওঠার পরও তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিসপ্লে বোর্ডে অন্য এয়ারলাইন্সের খবর থাকলেও বিমানের ঘরটি ফাঁকা। ভিসার মেয়াদ মাত্র একদিন থাকায় তিনি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বিমানবন্দর টার্মিনালের ভেতরে প্রচণ্ড গরম আর বাইরে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠেছে। মাস্কাটগামী যাত্রী ইব্রাহিম খলিল জানান, তার পকেটে মাত্র ৩০০ টাকা অবশিষ্ট আছে। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন কোথায় রাত কাটাবেন বা বাড়ি ফিরবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায়। অনেক নারী ও শিশুকেও ট্রলির ওপর বসে রাত পার করতে দেখা গেছে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আকাশপথ ও আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে আটকে পড়া ও নতুন করে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কয়েকটি দেশ এক্ষেত্রে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানানো হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বিমানবন্দরে অবস্থানরত কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং উদ্বেগ নিরসনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তেহরানে বাংলাদেশ মিশনের স্থাপনা, কূটনীতিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে আটকে পড়া যাত্রীদের রাত্রিযাপনের সুবিধা প্রদানের কথা বলা হলেও রাত ১১টা পর্যন্ত বিমানবন্দরে এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। অধিকাংশ যাত্রীই ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সরকারি সহায়তা বা ফ্লাইট বাতিলের খবর সময়মতো পাচ্ছেন না।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির কারণে কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত রেখে যাত্রীদের বিমানবন্দরে না আসার অনুরোধ জানিয়েছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের পাশে থাকার কথা বলেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি বলেন, সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

রাতে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধর্মমন্ত্রী বিমানবন্দর পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন। আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্বেগের কথা শোনেন এবং এই কঠিন সময়ে সরকার তাদের পাশে রয়েছে বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করেন।

যাত্রীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণেই যে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সে বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত তাদের যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। তিনি সকলকে ধৈর্য ধারণেরও আহ্বান জানান।