অর্থনীতি ঋণ নির্ভর
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।   ছবি: আরটিএনএন

আগামীর অর্থনীতি ঋণ নির্ভর হবে না, বরং বিনিয়োগ নির্ভর হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, অর্থনীতি বিনিয়োগ নির্ভর না হলে কখনো টেকসই হয় না। ঋণ নির্ভর অর্থনীতি কোথাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা ঋণ নির্ভর না হয়ে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতিতে বিশ্বাসী।

রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট ইন দ্য স্টক মার্কেট’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ) এই সেমিনারের আয়োজন করে।


সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আমরা একটি বড় প্রত্যাশার মধ্যে আছি এবং আশা করি তা পূরণ হবে। তবে পুঁজিবাজার বর্তমানে একটি বড় ধসের মধ্যে আছে। এটি মূলত আগের মডেল টেকসই না হওয়ায় ঘটেছে। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে, অর্থনীতি বিনিয়োগ নির্ভর না হলে টেকসই হয় না।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের বড় বিষয় হলো আস্থা। বিএনপির ইশতেহার দেখলে বোঝা যায় সেখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার রোডম্যাপ রয়েছে। আমরা দেশের জনগণকে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণে যুক্ত করতে চাই। উৎপাদন বা সেবায় জনগণের মালিকানা থাকতে হবে, যা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সম্ভব। পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে এ প্রক্রিয়া বেশি দেখা গেলেও আমাদের দেশে তা পর্যাপ্ত নয়।

প্রফেসর তিতুমীর বলেন, পুঁজিবাজারকে ফন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করতে হবে। বাজারে কারসাজি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। আমরা বাজার ভিত্তিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চাই। নিরক্ষক, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি এবং অন্যান্য মার্কেট ভিত্তিক রেগুলেটরদের সক্ষম করে তোলা হবে। কোম্পানিগুলোর প্রত্যয়ন সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে যেন দুর্বল কোম্পানি বাজারে প্রবেশ করতে না পারে।

তিনি বলেন, বিমান কেনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বন্ড মার্কেট থেকে অর্থায়ন করা যায় কিনা, তাতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে জনগণের বিনিয়োগকে কাজে লাগানো হবে। শেয়ারবাজারকে শুধুমাত্র শেয়ারের দর হিসেবে নয়, সর্বসাধারণের মালিকানার অংশীদার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রফেসর তিতুমীর আরও জানান, আমরা ১২০ দিনের রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছি এবং বাজেটে কী করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি। আশা করছি, বড় পরিবর্তন আসবে। অতীতে দেখেছি বিএনপির সময়ে পুঁজিবাজারে উন্নয়ন হয়েছিল। ভবিষ্যতেও আমরা সেই আশা রাখছি।

বিশেষ অতিথির বক্তব‌্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, গত দেড় বছরে পুঁজিবাজার–সংক্রান্ত প্রায় ২০০টি অভিযোগ তদন্ত হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব তদন্ত করেছে কমিশন। তদন্তের ভিত্তিতে প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, গত ১৮ মাসে কমিশন মোট ১৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অতীত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগে কখনো এত বেশি অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়নি।

তিনি বলেন, কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তা পরিশোধের জন্য অন্তত নয় মাস সময় দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ায় আদায়ে সময় লাগছে।

খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, আমরা যে অর্থদণ্ডগুলো করেছি, প্রতিটি ফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেই করা হয়েছে। তাই আশা করছি আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৭ কিংবা ২০২৮ সালের মধ্যে এই অর্থ আদায় করা সম্ভব হবে।

তিনি জানান, এই সময়ে কমিশন ৩০০–এর বেশি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। তদন্তের পর প্রথমবারের মতো মানি লন্ডারিং–সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। গত ১৮ মাসে এমন ১৬টি অভিযোগ দুদকে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি মামলাও হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, গত ২৫ বছরের ইতিহাসে স্বল্প সময়ের মধ্যে এত সংস্কার আগে হয়নি। কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিক আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, শুরুতেই মার্জিন ঋণ–সংক্রান্ত নীতিমালায় সংস্কার করা হয়। পরে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে ট্রাস্টি, সম্পদ ব্যবস্থাপক ও কাস্টডিয়ানদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে বণ্টন করা হয়েছে, যাতে কেউ দায় এড়াতে না পারে।

এ ছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও–সংক্রান্ত বিধিমালায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, আমরা চাই ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসুক। আগে যে কোম্পানিগুলো এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলো দুর্বল ছিল। তাই আইপিও রুলসে সংস্কার করে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পথ সহজ করা হয়েছে।

বন্ড বাজার উন্নয়নের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি খসড়া কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

গত দেড় বছরে কমিশনের কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, এই সময়ে ৮৪টি কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা আগের কমিশনের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি এসব সভায় আগের সময়ের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনার জন্য ইনটেনসিভ বা অতিরিক্ত প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। আগেও আমরা ইনটেনসিভ চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাতেও ভালো ফল আসেনি। বর্তমানে ৭.৫ শতাংশ ট্যাক্স পার্থক্য কম নয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, গত বছর আমরা ক্যাপিটাল গেইন (মূলধনী মুনাফা) ট্যাক্স কমিয়েছিলাম, দুই-তিন দিন বাজার ভালো হয়েছিল। পরে আবার অবনতি হলো। সমস্যার মূল কারণ ক্যাপিটাল গেইন নয়। ইনটেনসিভ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে উন্নত করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, মানুষ ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের পলিসিতে ত্রুটি আছে। বিশ্বের কোনো দেশের অর্থনীতি পুঁজিবাজার ছাড়া এগোতে পারেনি। আমাদের উদ্যোক্তাদের কেন পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করা যায়নি? এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছে।

মো. আবদুর রহমান খান বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী কেন আসবে? ব্যাংকের চেয়ে বেশি লাভের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অডিটর ও নিয়ন্ত্রকরা ভালো কোম্পানি বাছাই করে তালিকাভুক্ত করবেন, যেগুলো স্থিতিশীল মুনাফা দিতে সক্ষম। কিন্তু বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অধিকাংশই খারাপ পারফরম্যান্স করেছে, অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার পথে।

তিনি মিউচুয়াল ফান্ড নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডকে নিরাপদ বিনিয়োগ বলা হলেও এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। ইনটেনসিভ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি হবে না, আমাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান।

বক্তব্য দেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ, বিএসইসির কমিশনার মো. সাইসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার।