বায়ুদূষণ, ঢাকা
ঢাকার বাতাস মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।   ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের ১২৪টি নগরীর মধ্যে টানা তিনদিন বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকা ঢাকার অবস্থান নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজধানীর বাসযোগ্যতা, জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও—যখন যানবাহন চলাচল ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম তুলনামূলক কম থাকে—তখনও ঢাকার বাতাস ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে চলে যায়।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে ঢাকার গড় বায়ুমান সূচক ২৮৪-এ পৌঁছেছে। যা শ্বাস নেওয়ার জন্য গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ। নগরীর কয়েকটি এলাকায় সূচক ৪০০ ছাড়িয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। 

বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, ২০০-এর বেশি হলে বাতাস মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ৩০০ ছাড়ালে তা কার্যত জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ঢাকার বর্তমান অবস্থা সেই সীমার কাছাকাছি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তার ওপরে অবস্থান করছে।

আইকিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, আজ সকালে ঢাকার যেসব এলাকায় বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি ছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেড এলাকা (৪৮১), ধানমন্ডি (৩২৬), দক্ষিণ পল্লবী (২৯৬), বেচারাম দেউড়ি (২৮৩), ইস্টার্ন হাউজিং (২৮১), বে’জ এজওয়াটার (২৭১), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকা (২৪৫) ও গোড়ান (২৪০)।

কেন ঢাকার দূষণ এতো ভয়াবহ?

সাধারণত শুকনা মৌসুমে দিল্লি, লাহোর কিংবা করাচির মতো শহরগুলো দূষণের শীর্ষে থাকে। কিন্তু ঢাকার শীর্ষ অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, স্থানীয় দূষণের উৎসগুলো ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবাধ নির্মাণকাজ, ইটভাটার ধোঁয়া, পুরোনো ও অযোগ্য যানবাহন এবং শিল্পবর্জ্য—সব মিলিয়ে ঢাকার বায়ুতে বিষাক্ত কণার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দূষণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তব পর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় বায়ুদূষণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে এবং চলতি জানুয়ারিতেও প্রায় প্রতিদিনই রাজধানী বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকছে। যদিও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে এর কার্যকর ফল তেমন দেখা যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

প্রতিদিন ঢাকায় যে মাত্রার বায়ুদূষণ হচ্ছে তা সরাসরি মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর আঘাত হানছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও সুস্থ মানুষও দীর্ঘদিন এ ধরনের বাতাসে থাকলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে।

এ ছাড়াও শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের রোগ ও হৃদ্‌রোগ বাড়ার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ারও ঝুঁকি বাড়ছে।

নগরজীবন ও অর্থনীতির চাপ

ঢাকার দূষিত বাতাস নগরজীবনকে ক্রমেই দুর্বিষহ করে তুলছে। বাইরে খেলাধুলা করাও স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়বে—কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের মাধ্যমে।

দীর্ঘমেয়াদে ঢাকা বিদেশি বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তির জন্যও কম আকর্ষণীয় নগরীতে পরিণত হতে পারে।

সতর্কতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

আইকিউ এয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার, বাইরে কম বের হওয়া বা জানালা বন্ধ রাখা তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু এটি সমস্যার সমাধান নয়। সমস্যার মূলে রয়েছে দুর্বল নীতি বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের অভাব। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে খণ্ডিত উদ্যোগের বদলে প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, ইটভাটা ও নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার এবং নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

ঢাকার টানা তিনদিন শীর্ষ দূষিত নগরী হওয়া একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। এটি উপেক্ষা করা হলে রাজধানীর এই সংকট ধীরে ধীরে জাতীয় স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংকটে রূপ নিতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ঢাকায় শ্বাস নেওয়াই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এমকে/আরটিএনএন