দেশজুড়ে তীব্র এলপিজি সংকটের মধ্যে প্রথমবারের মতো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকারি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও ব্যবসায়ীদের একাংশ মনে করছেন, এটি সাময়িক সমাধান হতে পারে—দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে কাঠামোগত প্রস্তুতি ছাড়া কার্যকর ফল মিলবে না।
পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বাজারজাতের দায়িত্বে থাকা বিপিসি এত দিন এলপিজি বটলিং ও বাজারজাত করলেও সরাসরি আমদানিতে যায়নি। ফলে এলপিজি খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় জেটি, পাইপলাইন কিংবা স্টোরেজ সুবিধা তাদের নিজস্ব নেই। সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ইতিমধ্যে আমদানির অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটরদের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে তা বাজারে সরবরাহ করা হবে। বিপিসির দাবি, এতে করে বাজারে সাময়িক সংকট ও মূল্য অস্থিরতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
কেন তৈরি হলো সংকট
এলপিজি ব্যবসায়ীদের মতে, সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে ইরান থেকে তেল ও এলপিজি আমদানি এবং পরিবহনে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জাহাজ সংকট তৈরি করে। এর পাশাপাশি এলসি জটিলতায় গত ডিসেম্বরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কম থাকায় বাজারে ঘাটতি প্রকট আকার নেয়।
এই পরিস্থিতিতে কিছু ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য কোথাও কোথাও ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে ভোক্তাদের। অটোগ্যাস পাম্পগুলোতেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন এলপিজি ব্যবহারকারী যানবাহনের চালকেরা।
ব্যবসায়ীদের মতামত
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বিপিসির উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। তাঁর মতে, বিপিসি আমদানি করলেও খালাস ও সংরক্ষণের জন্য বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভর করতে হবে। সংকট কেটে গেলে ব্যবসায়ীরা যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে এলপিজি না পান, তাহলে বিপিসির কাছ থেকে কেনার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
দেশের বড় এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, বর্তমানে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা সাময়িক। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অবকাঠামো ও লাইসেন্সের প্রশ্ন
বিপিসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে উৎপাদিত উপজাত এলপিজি দিয়ে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ পূরণ হয়। পুরো বাজারটাই বেসরকারি খাতনির্ভর। আবার বিপিসির নিজস্ব এলপিজি স্টোরেজ, পাইপলাইন বা জেটি নেই। তাই কুতুবদিয়ায় বেসরকারি অপারেটরদের লাইটারিং জাহাজ ও টার্মিনাল ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, বিপিসি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির লাইসেন্সধারী। এলপিজি আমদানির জন্য সংশোধিত আবেদন করা হলে সেটিও লাইসেন্সের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
দাম ও আমদানির চিত্র
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা থাকলেও ২০২৫ সালে এলপিজি আমদানি কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টনের বেশি, সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টনে।
চলতি জানুয়ারিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বিইআরসি নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় ৫৩ টাকা বেশি। তবে বাস্তবে অনেক ভোক্তাকে এর প্রায় দ্বিগুণ দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
সামনে কী
বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদন মিললে দ্রুত জিটুজি পর্যায়ে কোটেশন আহ্বান, সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদন ও সরবরাহ আদেশ দেওয়া হবে। লক্ষ্য একটাই—বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম স্থিতিশীল করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট এড়াতে আমদানির অনুমতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজার তদারকিতে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। নইলে বিপিসির এই উদ্যোগও থেকে যেতে পারে কেবল সংকটকালীন এক সাময়িক ব্যবস্থায়।
এমকে/আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!