সিরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
সিরীয় সেনাদের অগ্রযাত্রা রুখতে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র   ছবি: সংগৃহীত

উত্তর সিরিয়ার কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সিরীয় সেনাদের অগ্রযাত্রা রুখতে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী কৌশলগত অবস্থান এবং তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সাথে সিরীয় বাহিনীর সংঘর্ষের জেরে এই আহ্বান জানানো হয়।

আলেপ্পো এবং এর পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর কুর্দিশ নেতৃত্বাধীন ‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস’ (এসডিএফ) নদীর পূর্ব দিকে সরে যেতে রাজি হওয়ার পরই শনিবার সিরীয় সেনারা দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। এসডিএফ-কে সিরীয় রাষ্ট্রের কাঠামোর সাথে একীভূত করার পরিকল্পনা থমকে যাওয়ার কারণেই এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান ব্র্যাড কুপার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আলেপ্পো শহর এবং রাক্কা প্রদেশের তাবকা শহরের (আরও ১৬০ কিমি পূর্বে) মধ্যবর্তী এলাকায় সিরীয় সেনাদের “যেকোনো আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত”।

পাল্টাপাল্টি দাবি ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ :
শনিবার সিরীয় সেনাবাহিনীর অপারেশন কমান্ড আল জাজিরাকে জানায়, সেনাবাহিনী তাবকায় প্রবেশ করেছে, যেখানে একটি বাঁধ ও সামরিক বিমানঘাঁটি রয়েছে। তবে এসডিএফ শুরুতে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল তাদের বাহিনী সেখানে এখনও অবস্থান করছে। অবশ্য পরে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানায়, সরকারি বাহিনী শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

এসডিএফ এর আগে আলেপ্পোর দেইর হাফের ও মাকসানাসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। শনিবার সিরীয় সেনাবাহিনী এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং এসডিএফের বিরুদ্ধে সেনা টহলে হামলা চালিয়ে দুই সৈন্যকে হত্যার অভিযোগ তোলে।

অন্যদিকে, এসডিএফ দামেস্কের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, যোদ্ধারা পুরোপুরি সরে যাওয়ার আগেই চুক্তি লঙ্ঘন করে সরকারি বাহিনী শহরে প্রবেশ করেছে। এসডিএফ এক বিবৃতিতে জানায়, “আমাদের বাহিনী এবং দামেস্কের দলগুলোর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলছে। তারা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং সেনা প্রত্যাহারের সময় আমাদের বাহিনীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।” এসডিএফ আরও জানায়, তাবকা শহরটি সেনা প্রত্যাহার চুক্তির আওতাভুক্ত ছিল না, তাই তারা শহরটি এবং এর পার্শ্ববর্তী একটি তেলক্ষেত্র রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।

তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ও সংঘাত :
আল জাজিরার প্রতিনিধি জেইন বাসরাভি জানান, রাক্কা প্রদেশে গোলাবর্ষণ চলছে। তিনি বলেন, “সেখানে যে পরিমাণ ভারী অস্ত্র, দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং গোলাবারুদ দেখা যাচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এসডিএফ-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা তেলক্ষেত্রগুলোর দখলের জন্য তীব্র লড়াই চলছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে।” সিরিয়ান পেট্রোলিয়াম কোম্পানি শনিবার জানিয়েছে, সেনাবাহিনী এসডিএফের কাছ থেকে দেইর হাফের ও মাকসানা দখলের পরপরই আল-রাসাফা এবং সাফিয়ান তেলক্ষেত্র দুটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মার্কিন নীতি :
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘদিনের মিত্র এসডিএফ এবং ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসা নতুন সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সিরিয়া নীতি নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। শনিবার মার্কিন দূত টম ব্যারাক ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি অঞ্চলে এসডিএফ প্রধান আবদি এবং ইরাকি কুর্দি নেতা মাসউদ বারজানির সাথে বৈঠক করেন।

বাগদাদ থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি বার্নার্ড স্মিথ জানান, কুর্দি ভাষা ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতির বিষয়ে ইতিবাচক কথাবার্তা বলা হলেও মূল সমস্যা এখনো অমীমাংসিত। হাজার হাজার ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও প্রশিক্ষিত এসডিএফ যোদ্ধাদের কীভাবে সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হবে, তা নিয়ে সংকট কাটছে না। গত বছর এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি, যার ফলে জানুয়ারির শুরুতে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

সূত্র: আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই