ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিশ্বরাজনীতি
ট্রাম্পের একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বাঁক-বদল করছে বিশ্বরাজনীতি   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে নিজের দখলে নেওয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তার এই হঠকারী পদক্ষেপে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটো। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আটলান্টিকের দুই পারের এই ফাটল রাশিয়া ও চীনের জন্য ঐতিহাসিক বিজয় বয়ে আনতে পারে।

শুল্ক আরোপের হুমকি ও সময়সীমা :
ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে দ্বীপটি দখলে নিতে চান ট্রাম্প। এই প্রচেষ্টার বিরোধিতাকারী দেশগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত শনিবার তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের সব পণ্যের ওপর ১০% শুল্ক আরোপ করা হবে। কোনো সমঝোতা না হলে ১ জুন থেকে এই শুল্ক বেড়ে ২৫% করা হবে।

ন্যাটোর অস্তিত্ব সংকট :
গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প। রিপাবলিকান নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, এটি ন্যাটোর মূলভিত্তি ‘আর্টিকেল ৫’ বা সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির লঙ্ঘন হবে। টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি এবং হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ার এমেরিটাস মাইকেল ম্যাককল এবিসি নিউজকে বলেন, “একটি ন্যাটো দেশের ভূখণ্ড দখল করতে সামরিক আগ্রাসন চালানো ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এর অর্থ হলো কার্যত ন্যাটোর সাথেই যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। এটি ন্যাটোকে ধ্বংস করে দেবে।” ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই কৌশল হঠকারী এবং এটি শুধু ডেনমার্ক নয়, ন্যাটোর সব মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে।

ইউরোপীয় নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া :
ট্রাম্পের এই হুমকির পর রবিবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা জরুরি বৈঠকে বসেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ট্রাম্পের এই আচরণকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আঞ্চলিক আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো হুমকি বা ভয়ভীতি আমাদের প্রভাবিত করতে পারবে না।” ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও ট্রাম্পের সাথে ফোনে কথা বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মেলোনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে তিনি একমত নন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনের অবস্থান :
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রবিবার ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে এনবিসিকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। ইউরোপ দুর্বলতা প্রকাশ করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রদর্শন করছে। এটি প্রেসিডেন্টের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।” তবে সিনেটর র‍্যান্ড পল এবং টিম কেইন ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতা বা ‘ওয়ার পাওয়ার’ সীমিত করতে কংগ্রেসে নতুন প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা করছেন। তারা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কৌশলগত গুরুত্ব বনাম বাস্তবতা :
ট্রাম্প দাবি করছেন, তার ‘গোল্ডেন ডোম’ মিসাইল ডিফেন্স প্রকল্পের জন্য গ্রিনল্যান্ড জরুরি। তবে বর্তমানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের ঘাঁটি রয়েছে এবং ডেনমার্কের সঙ্গে সামরিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সেনা মোতায়েন করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত জেদ এবং ‘রিয়েল এস্টেট’ মানসিকতা থেকে ট্রাম্প এই সংকট তৈরি করছেন, যা ন্যাটোর ৭৭ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ন্যাটো ভেঙে পড়লে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো হুমকির মুখে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

সূত্র : সিএনএন

আরটিএনএন/এআই