“সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে। শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার। হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে। গাড়িবাড়ি—সবকিছু দামী তার।”
বয়স হয়েছে, অথচ মান্না দের কণ্ঠে “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা” গানটি শোনেননি—এমন বাঙালি কম। এসব গান স্মৃতিকাতর করে, মনে করিয়ে দেয় পুরোনো দিনের কথা। লিখতে বসেছিলাম ডাকসাইটে কূটনীতিক হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে নিয়ে। কিন্তু কেন সুজাতার কথা মনে পড়ল, সেটা আগে খোলাসা করে বলি।
ভদ্রমহিলার নাম সুজাতা সিং। তিনি তখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। চৌদ্দ সালের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে তুমুল উত্তেজনা। রাজপথ রক্তাক্ত। পরিষ্কার হচ্ছিল যে হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি-জামায়াত। হঠাৎ বড় প্রশ্ন সামনে এলো—জাতীয় পার্টি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তখন ভোটে না যাওয়ার ব্যাপারে অনড়। যদিও তাঁর জীবনে স্থিরতা ছিল খুবই কম। সে সময় এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন সুজাতা। বলেন, নির্বাচনে যেতে। না হলে জামায়াত-শিবির ক্ষমতায় আসবে। এরশাদ পরে প্রেস ব্রিফিং করে সে তথ্য ফাঁস করে দেন।
কিছুদিন পরই তাঁর ঠাঁই হয় হাসপাতাল নামের আধুনিক কারাগারে। সেখান থেকেও অবশ্য তিনি নিয়মিত ঢাকার অন্তত দুজন সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। বলছিলেন, নির্বাচনে যাবেন না। মনোনয়নপত্রও প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু স্ত্রীকে তাঁর বিপরীতে সামনে নিয়ে আসা হয়। সে গল্প এখানে পুরো প্রাসঙ্গিক নয়।
এরপর আমরা যেটা দেখি—হাসিনার শাসন টিকিয়ে রাখতে মূখ্য ভূমিকা রাখে দিল্লি। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—দুইভাবেই তারা ছিল পূর্ণমাত্রায় সক্রিয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারেও তাদের ভূমিকা কান পাতলেই শোনা যেতো। কূটনীতিতে একটি কথা প্রায়ই বলা হয়—সব আম এক ঝুড়িতে রাখতে নেই। কিন্তু ভারত সেটাকে থোড়াই কেয়ার করেছে।
৫ আগস্টের আগমন ধারাবাহিক আবার আকস্মিকও। দিল্লির খেলোয়াড়রা ভাবেনি, এভাবে তাদের গুটির এখানে পতন হবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তারা চেষ্টা করে গেছে। অজিত দোভাল শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে-পরে দিল্লির দাদাগিরির প্রতিবাদে মুখর হয়েছে বাংলাদেশ—বিশেষ করে এখানকার তরুণ প্রজন্ম। এটা অবশ্য পুরো দক্ষিণ এশিয়ারই চিত্র। দাসত্ব কেইবা মানতে চায়!
ঢাকায় যে শেখ হাসিনার পতন হয়েছে, এটা দিল্লি মেনে নিলেও মনে নেয়নি। এর আগে বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেই ভারতীয় মুখপাত্র বলতেন—এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। হঠাৎই তাঁর ভোল পাল্টে যায়। তিনি বলতে থাকেন, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ দেখতে চায় ভারত।
শেখ হাসিনাকে কেবল আশ্রয় দিয়েই দিল্লি শান্ত হয়নি। প্রতিদিনই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলেছে অপপ্রচার। ভারতীয় মিডিয়া তো রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই সপ্তাহেও দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা, অডিও মাধ্যমে কথা বলেছেন শেখ হাসিনাও। ৫ আগস্টের পর থেকে অবশ্য তাঁর চেহারা দেখা যায়নি। সেটাও এক রহস্য!
নতুন বাস্তবতায় ভারত অবশ্য বাংলাদেশে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করে। ক্রীড়াশীল বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগই ছিল সবচেয়ে সহজ। তবে জামায়াতসহ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে ভারত কীভাবে যোগাযোগ করে—এটা নিয়ে সবারই কৌতূহল ছিল। পর্দার আড়ালে অবশ্য ভারতীয় দূতাবাসের শীর্ষ ব্যক্তি দেখা করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে। জামায়াত প্রধান তখন অসুস্থ ছিলেন। শনিবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
যখন মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে ক্রীড়াশীল সব দলের সঙ্গেই যোগাযোগ চায় ভারত, তখন তাদের মনে আসলে কী আছে তাই যেন প্রকাশ করে দিলেন হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। তাঁর বক্তব্য পড়ছিলাম সমকাল-এ। শ্রিংলা ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। একসময় ঢাকায় হাইকমিশনার ছিলেন। বর্তমানে রাজ্যসভার সদস্য। শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে অনিয়ম হলেই কেবল জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে। তাঁর দাবি, সুষ্ঠু নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কখনো জিততে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। শ্রিংলা বলেন, “কেউ তাদের (জামায়াত) আগে নিয়ে আসছে। তারপরও নির্বাচনে অনিয়ম হলেই তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে। নইলে আসা অসম্ভব।”
এটা ঠিক, বাংলাদেশে নতুন এক প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ নেই। লড়াইটা হবে বিএনপি বনাম জামায়াত। কোনো কোনো জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের।
ভোট আমাদের, অথচ পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘুম নেই। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার মন্তব্য বহুকিছু খোলাসা করে দেয়। এ দেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের চাওয়া কী—তাও স্পষ্ট। আমরা বাংলাদেশে বসে নিশ্চিত করে জানি না, আগামী নির্বাচনে কী হবে। কিন্তু ভারতে বসে হর্ষ বর্ধনরা ঠিকই সব জানেন। যদিও গেল তিনটি পাতানো নির্বাচন নিয়ে তাদের চোখ ও মুখ ছিল বন্ধ। তখন তারা কিছুই দেখেননি!
ঢাকা না দিল্লি—এই স্লোগান মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। এটাই এখন বাস্তব। এ বাস্তবতায় মন খারাপ সুজাতা সিংদের। প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ভাষা ও সংস্কৃতিরও রয়েছে মেলবন্ধন। কিন্তু দুই বন্ধুর সম্পর্ক হতে হয় সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। বন্ধুত্বে দাসত্ব চলে না।
আশা ও শঙ্কা—দুটোই আছে। বহু বছর পর এ ভূমির মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জেয়াফত। আশা করি, ভোট হবে উৎসবমুখর। মানুষ তার প্রতিনিধি বেছে নেবে। জনগণের রায়ই গণতন্ত্রে শেষ কথা। ভোটের আগে শ্রিংলাদের রায় আমাদের প্রয়োজন নেই।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!