হাসিনা, কৌতুক
দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।   ছবি: আরটিএনএন

ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন আর কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; কৌতুক করে করে তিনি ক্রমেই নিজেকে রাজনৈতিক মিস্টার বিনে পরিণত করেছেন। ভারতে অবস্থান করে ভার্চ্যুয়াল বক্তব্য, রেকর্ড করা অডিও ভাষণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি যে রাজনৈতিক বয়ান হাজির করছেন, তা অনেক সময় কৌতুকের সীমা ছাড়িয়ে বিদ্রূপে রূপ নিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, সংসদীয় গণতন্ত্র ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে পলাতক সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, আমি আশা করব তারা আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।’ তাঁর ভাষায়, প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কখনো সংসদ হতে পারে না!

এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌতুক। কারণ, শেখ হাসিনা নিজে ক্ষমতায় থাকাকালীন টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এক প্রকার জোর করেই হাসিনা সেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। আর এ নির্বাচনগুলোর মাধ্যমেই সংসদে জাতীয় পার্টিকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে রেখে কার্যত একদলীয় শাসনের কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি বিরোধী দলকে সরকার ও সংসদ—উভয় জায়গায় রেখে রাজনৈতিক প্রহসনের নজিরও স্থাপন করেছিলেন তিনি। সেই শেখ হাসিনার মুখে এখন ‘প্রকৃত বিরোধী দল’ ও ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’-এর কথা শোনাকে নিতান্তই হাস্যকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও গুরুতর একটি বিষয়—জুলাই গণহত্যা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; তিনি ক্ষমাও চাননি। বরং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তিনি ঘৃণা বা বিদ্বেষপূর্ণ (হেইট স্পিচ) বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়াও তাঁর বিরুদ্ধে বিবেচিত অপরাধগুলোর একটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অবজ্ঞাসূচক ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যগুলোও বিচারিক পর্যবেক্ষণে এসেছে।

নেটিজেনরা বলছেন, শেখ হাসিনা আগে থেকেই দাম্ভিকপ্রকৃতির মন্তব্য করে অভ্যস্ত। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেখ হাসিনার অনেক কৌতুকময় মন্তব্য এখনও জনপ্রিয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে তিনি বারবার ‘বিকল্প রেসিপি’র পরামর্শ দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। কখনো বেগুনের পরিবর্তে কুমড়া দিয়ে বেগুনি রান্নার কথা বলেছেন, কখনো পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার পরামর্শ দিয়েছেন, কখনো কাঁচামরিচের বদলে শুকনো মরিচ পানিতে ভিজিয়ে ব্যবহারের উপদেশ দিয়েছেন। এমনকি মাংসের বিকল্প হিসেবে কাঁঠাল দিয়ে বার্গার বা শামি কাবাব বানানোর কথাও বলেছেন।

২০২০ সালের রমজান মাসে সংসদে বেগুনের দাম নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ২০১৯ সালে পেঁয়াজ সংকটে ‘পেঁয়াজ ছাড়া রান্না সম্ভব’ মন্তব্য কিংবা কাঁচামরিচ সংরক্ষণের পরামর্শ—সব মিলিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান ‘রেসিপি আপা’ নামে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তির বাস্তবতা স্বীকার না করে এমন মন্তব্য অনেকের কাছে সহানুভূতির বদলে ব্যঙ্গের জন্ম দিয়েছিল।

ক্ষমতা হারানোর পরও এই প্রবণতা থেমে নেই। বরং ভারতে বসে তাঁর বক্তব্য আরও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রূপ নিচ্ছে। দিল্লিতে ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সেমিনারে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিও ভাষণ বাজানো নিয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন পলাতক ব্যক্তিকে ভারতের রাজধানীতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির পরিপন্থি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই বক্তব্যে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান এবং তাঁর দলীয় অনুসারীদের সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি দেন—যার উদ্দেশ্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা। বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করেছে, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারত শেখ হাসিনাকে এখনো হস্তান্তর না করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

অন্যদিকে, ভারতের কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন, বাক্‌স্বাধীনতার কারণে দিল্লি চাইলে এমন অডিও ভাষণ বন্ধ করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। এই নীরবতাও দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন ও জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতীক। যিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন গণতন্ত্রকে সংকুচিত করেছেন, বিরোধী রাজনীতিকে দমন করেছেন এবং জনগণের দুর্ভোগকে ‘রেসিপি’ দিয়ে এড়িয়ে গেছেন—তিনি আজ ক্ষমতার বাইরে বসে সংসদীয় গণতন্ত্রের নসিহত দিচ্ছেন। এই বাস্তবতায় তাঁর বক্তব্য আর কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, অনেকের চোখে তা ইতিহাসের সঙ্গে নির্মম কৌতুক।