রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধজাহাজের উন্নয়ন, সাবমেরিন ও সামরিক ড্রোন সংগ্রহ কিংবা এসব বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ—সব মিলিয়ে প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় সরকারের সক্রিয়তা স্পষ্ট। এই উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে তুলনা করলে নানা প্রশ্নও সামনে আসে।
বাংলাদেশ ফোর্সেস গোল–২০৩০ অনুযায়ী সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নতুন নয়। আকাশ ও সমুদ্রসীমা সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য সামরিক আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ অনেকেই মনে করেন এই সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান, চীন, ইউরোপীয় দেশসমূহ, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বা আগ্রহ প্রকাশ একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থানের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আগ্রহ যেমন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সংবেদনশীল, তেমনি চীন থেকে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ইউরোপীয় কনসোর্টিয়ামের ইউরো ফাইটার টাইফুনে আগ্রহ, তুরস্কের অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার কেনার আলোচনা প্রমাণ করে—সরকার কোনো একক কৌশলগত বলয়ে আবদ্ধ থাকতে চায় না।
তবে এই বহুমুখী উদ্যোগের আর্থিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবিত ব্যয়ই কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় বাজেটে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সামরিক কেনাকাটার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ড্রোন নির্মাণে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হলেও, সেটিও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।
অর্থনৈতিকভাবে যখন দেশ বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে, তখন একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, বড় অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়োর অভিযোগও শোনা যাচ্ছে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সৃষ্টি করতে পারে এমন চুক্তির ক্ষেত্রে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো যৌক্তিক। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি ‘কী প্রয়োজন’ তার চেয়েও বেশি ‘কখন এবং কোন পর্যায়ে’ তা করা উচিত—এ নিয়ে।
সমালোচকদের একটি বড় গোষ্ঠী বলছে, এই সরকার যেহেতু নির্বাচিত নয়, তাই এর প্রধান বৈধতা নির্ভর করে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন আয়োজনের ওপর।
সব মিলিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সক্রিয়তা একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা চিন্তার ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে সরকারের ঘোষিত সীমিত দায়িত্বের সঙ্গে এক ধরনের বৈপরীত্যও তৈরি করেছে। এই উদ্যোগগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য কতটা অপরিবর্তনীয় দায় সৃষ্টি করবে, তা নির্ভর করবে সিদ্ধান্তগুলোর স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ওপর। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের মতো মৌলিক কাজগুলো কতটা গুরুত্ব পায়—শেষ পর্যন্ত সেটিই এই সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে থাকবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!