নির্বাচন
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহার ।   ছবি: সংগৃহীত

ডিকশনারিতে যে ভাবে পাওয়া যায়,তাহলো 'প্রতিশ্রুতি' (Promise) এবং ' ইশতেহার ' (Manifesto) শব্দ দুটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, আর যেখানে প্রতিশ্রুতি মানে 'অঙ্গীকার' বা 'ওয়াদা', আর ইশতেহার হলো একটি রাজনৈতিক ইশতেহার যা নির্বাচনের আগে দলগুলো জনগণের কাছে তাদের গৃহীত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি বিস্তারিত লিখিত তালিকা হিসেবে প্রকাশ করে, তাই বলা যায় ইশতেহার হলো প্রতিশ্রুতিগুলোর সমষ্টি বা সমষ্টিগত প্রতিশ্রুতির প্রকাশ। 

নির্বচন সামনে এলে দেখা যায়, সব রাজনৈতিক দল তাদের এজেন্ডা বাস্তায়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার জনগনের সামনে উপস্থাপন করে  থাকে। যা তারা বাস্তবায়ন করবে বলে ওয়াদা করে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান ভাগ হওয়র পর থেকে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের বয়স ৫৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত  জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ১২টি।

এর মধ্যে চারটি নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আর বাকিগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে দলীয় সরকার বা সামরিক শাসনের অধীনে। অধিকাংশ নির্বাচনের পরই অভিযোগ উঠেছে কারচুপি আর অনিয়মের। 

স্বাধীনতার পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আমল ১৯৭২-১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন পুনর্গঠনের সময় ছিল। কিন্তু তা না করে তিনি এক হত্যাশার কালো অধ্যায় রচনা করেছেন। যা আজও আমাদের তাড়া করছে। যা হোক, শেখ মুজিবের শাসন আমলের গুনিমানে কিছু কৃর্তি তুলে ধরা যাক, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এই দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবে ২৭,০০০ মানুষ মারা গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের মত। 

এর কারণ হিসাবে ধরা যায়, খাদ্যশস্য মজুতদারি, প্রতিবেশী দেশে পাচার এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বাকশাল ও একদলীয় শাসনের লক্ষে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা (বাকশাল) চালু করা হয়। ফলে সরকারি চারটি পত্রিকা বাদে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়, যা  সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ ও বাকস্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হানে। রক্ষীবাহিনী ও মানবাধিকার লঙ্ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বামপন্থী বিদ্রোহ দমনের নামে রক্ষীবাহিনী গড়ে তুলে  ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মীদের গুম এবং নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ১৯৭৩-৭৪ সালেই প্রায় ২,০০০ রাজনৈতিক বন্দিকে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়-স্বজন ও অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, যা দক্ষ আমলাতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যা লুটতরাজ ও স্বজনপ্রীতি বহি:প্রকাশ ঘটে। 

১৯৭২-৭৩ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ৪,৯২৫টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং হাজার হাজার চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ পায়। ১৯৭৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি ও বিরোধী প্রার্থীদের ওপর চাপের ও হয়রানির মাধ্যমে প্রায় সব আসনেই বিজয় নিশ্চিত করে। সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি আধুনিক অস্ত্র ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করায় বাহিনীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যা বাজেট বৈষম্য মাধ্যেমে এ ক্ষোভের জন্ম হয়। 

সামরিক বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাদের পদোন্নতি ও অগ্রাধিকার নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল করে তুলে যা মুক্তিযোদ্ধা ও অ-মুক্তিযোদ্ধা দ্বন্দ্বে রুপ নেয়। এসব কর্মের মাধ্যেমেই জনতার নেতা থেকে এক অভিশপ্ত নেতা হিসাবে আভির্ভূত হয়। যার ফল ভোগ করতে হয় একটি অভ্যুত্থানে সহপরিবারে নিহত হওয়ার মাধ্যে। শেখ মুজিবের শাসন আমলে কিছু সফলতাও ছিল খুবই গুরুত্বপূন তা হলো-ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন,আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সদস্যপদ লাভ,সংবিধান প্রণয়ন,শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন,প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত চুক্তি,কৃষি ও শিল্প সংস্কার,যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

উলেখ্য যে, ৭ই মার্চ ১৯৭৩ সালে ১৪টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ  ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে এগারোটি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ৭০নির্বাচনের রীতি ২০১৮ সালে ফিরিয়ে আনলেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে ৫৪ প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে।

এরপর জিয়াউর রহমানের শাসনের অধ্যায় সূচনা হয়, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে ৩০ মে ১৯৮১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সামগ্রিকভাবে তিনি প্রায় ৪ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তথ্যমতে , অল্প সময়ে বেশ কিছিু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো ,বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার,কৃষি বিপ্লব ও খাল খনন কর্মসূচি,অর্থনৈতিক সংস্কার ও শিল্পায়ন,সার্ক (SAARC) গঠন,নারী ও শিশু কল্যাণসহ নানা মুখী কর্মসূচির মাধ্যেমে বেশ প্রশংসা ও খ্যাতি অর্জন করে ছিলেন। তিনি শসক হিসাবে দেশ ও জাতির কল্যানে অসাধারণ ভূমিক পালন করেছেন । স্বাধীনতা সাভৌমত্ব প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন তিনি। সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদ আগ্রাসন বিরুদ্ধী ভূমিকায় সোচ্চার ছিলেন। যার করুণ পরিনতি ভোগ করতে হয়েছিল সেনা বিদ্রোহীদের মাধ্যেমে শাহাদাত বরণ করেন।

২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। বাংলাদেশে ৯ বছর (১৯৮২-১৯৯০) ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনের সময় ভোট ব্যাংক নিজেদের আয়াত্বে রাখার জন্য কৌশল হিসাবে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা মুসলমানদের খুশির কারণ হয়। তা হলো ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা এবং শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা।

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভিশন বা প্রধান লক্ষ্য ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা,অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্তবাজার অর্থনীতি,শিক্ষা ও সামাজিক খাত,অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের বিপরীতে বিএনপি একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণএবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের কথা প্রচার করেছিল। খালেদা জিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য ছিল, "দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই"। উল্লেখ্য, তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সে সময় সরকার গঠন করেছিল।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ,সংসদীয় গণতন্ত্র ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার,অর্থনৈতিক মুক্তি ও দারিদ্র্য বিমোচন,খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা,সুশাসন ও দুর্নীতি দমন,নারীর ক্ষমতায়ন। ৯৬ তে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের ব্যবসা তেমন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও ২০০৮ সালে এসে ব্যবসায় পুরদমে জমজমাট রুপ নেয়। যা পরাষ্ট্র নীতি মধ্যেমে সফলতার মুখ নেয়। পররাষ্ট্র নীতি ছিলো সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়" এ নীতি ২০১৮ তে এসে ভালোবাসায় ও সম্পের্কে রুপ নেয়। যা পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পের্কে রুপান্তরিত হয়। যার আর্শীবাদ হিসাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচুত্য হয়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে স্বমী-স্ত্রীর ভালোবাসার সম্পর্কের প্রতিদান হিসাবে স্বাক্ষর রেখেছেন।

এর পর ২০০১ সালে বাংলাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন  চারদলীয় জোট সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২১৫টিরও বেশি আসন পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল বিষয়গুলো ছিলো সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন,অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি,বিচার বিভাগের স্বাধীনতা,শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এর মধ্যে যোগাযোগ ও প্রযুক্তি,শিক্ষা ও নারী উন্নয়ন,পরিবেশ রক্ষা,আইন-শৃঙ্খলাসহ কিছু বিষয় সফল্য হলেও ব্যর্থতায় গ্রাস করেছিল সফলতাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো দুর্নীতি,  দুর্নীতিমুক্ত সমাজ" গড়ার কথা থাকলেও  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TIB)-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার বিশ্বে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ইশতেহারে সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার থাকলেও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালে দেশজুড়ে একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘেটেছিল যা জোট সরকারের ব্যর্থতার চিত্র সামনে আসে।

তার পর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পরবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গভীর রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়। যার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মুখে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। যা ইতিহাসে ১/১১ নামে পরিচিত। এই সরকারের দায়িত্বে আসেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে। সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং দুর্নীতি দমনের নামে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করে,তাদের ক্ষমতার রাস্তা দীর্ঘায়িত করে। 

নানা নাটকীয়তার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন 'মহাজোট' নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জয় লাভ করে। তাদের ইশতেহারের ভিশন ছিলো ডিজিটাল বাংলাদেশ,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার,দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ,দুর্নীতি দমন,বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা মিটানো। এগুলোর মধ্যে কিছুটা সফলতা অংশিদার হয়েছিলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে ডিজিটাল দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নামে প্রহসন,ভিন্নমত দমন , দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের নামে মানুষের দুর্বীষহ জীবন পরিচালনা করতে হয়েছে। ব্যর্থ্যতার আরও কিছু দিক হলো, গণতন্ত্রের সংকট ও নির্বাচনী বিতর্ক,অবাধ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার,মানবাধিকার লঙ্ঘন,ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা,বাক-স্বাধীনতা সংকোচন,দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতা। 

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেগা প্রকল্পগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়, মেগা দুর্নীতি , দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করে দেশকে গভীর সংকটের মধ্যে নিমজ্জিত করেছিল। এই সরকারের এসময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ভিন্নমত দমন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামে জুডিশিয়াল কিলিং এ এক উন্মাদনা খেলায় মেতে ওঠে ছিল। যার বলি হয়ে ছিলো বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের ডজন খানেক নেতা,বিএনপিরও কিছু নেতা, তাদের মধ্যে প্রাণে বেঁচে ফিরলেন ২দলের দুইজন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যেমে। 

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা জুলাই গণঅভুত্থানে ক্ষমতাচুত্য হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে একটি রক্তাক্ত জুলাইয়ের মধ্যে দিয়ে, তার একটা তালিকা তুলে ধরা হলো, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সরকারি তথ্যমতে শহীদ হয়েছেন ৮৩৬ জনের বেশি এবং আহত হয়েছেন ১৩,৮০০ জনের বেশি মানুষ। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্য উপ-কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ১,৫৮১ জন এবং আহতের সংখ্যা ২০,০০০-এর বেশি। এ প্রতিবেদন তৈরির সময়ও এক জন শহীদ হয়েছেন। তাই এটি একটি চলমান তালিকা, যা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
 
আমরা যাদি একটু পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ঠিক কি কারণে এত সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম তার নমুনা তুলে ধারা যাক, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়; জন্ম নেয় ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানের ছিল দুটি অংশ। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। অপর অংশটি পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পূর্ববাংলার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে এবং বৈষম্য সৃষ্টি করে। ১৯৪৮সালে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন,১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান,১৯৭০ সালের নির্বাচনই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিজ অঙ্কুরিত হয়। 

এ সব কিছুর মুলে একটাই লক্ষ ছিলো, নির্যাতন, নিপিড়ন, শোষন, বঞ্চনা,আধিকার আদায়, স্বাধীন স্বার্ভৌমত্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা,স্বনিভর জাতী হিসাবে বিশ্বের বুকে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমাদের সহস্র সংগ্রামের পথ পেড়িয়ে স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসেও স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে পরেনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনগণ। এযাবতকালে ১২টি নির্বাচন হলেও প্রতিটি নির্বাচনে বিদেশি উপনিবেশবাদের কালো ছায়ার হস্তক্ষেপে নির্বাচনে জনগণের আশা আঙ্খা পূর্ণ প্রতিফলিত হয়নি। 

সকল দলের নির্বাচনী ইশতেহারে, নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিপূর্ণ ভাবে রক্ষা করতে পারেনি কোন সরকার। তারা দেশকে তেমন কিছুই দিতে পারেনি। তবে যে সরকারেই ক্ষমতায় এসছে ,তাদের এমপি,মন্ত্রী , সরকারী আমলা, সরকারী কর্মকতাদের ভার্গের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দেশ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোন পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়নি। তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ছিলো,সাধারণ মানুষ কে ধোকা দিয়ে ক্ষমতায় এস নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। বিগত নির্বাচনে যার অংশগ্রহণ করেছেন,তাদের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি ঋণ খেলাপি, অন্ধকার জগতের মাফিয়া, তাদেরকে দিয়ে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তণ চাওয়া, বানরের গলায় মুক্তার হার পড়ানোর নামন্তর।