মশা, গবেষণা, নগর ব্যবস্থাপনা
মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী।   ছবি: সংগৃহীত

‘ঘরে মশা, বাইরে মশা—যেখানেই যাই মশা।’ রাজধানীর বহু মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এখন যেন এই এক বাক্যেই ধরা পড়ে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিন-রাত মশার যন্ত্রণা থেকে তাদের রেহাই নেই। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি এমন হয় যে অনেকের মনে হয় যেন মশার ঝাঁক তুলে নিয়ে যাবে। কয়েল, অ্যারোসল বা রিপিলেন্ট ব্যবহার করেও মশা কমছে না—এমন অভিযোগও নগরবাসীর।

কেবল রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন শহরেও মশার প্রকোপ হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। ফলে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা অন্যান্য মশাবাহিত রোগের আশঙ্কা নতুন করে সামনে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় দেড় হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এখনো পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ করেনি, বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বর্তমান অবস্থা নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামনে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মশার বর্তমান ভয়াবহ উপদ্রবের পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করছে—প্রশাসনিক দুর্বলতা, পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকর উপস্থিতির অভাব। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম দুর্বল থাকায় সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের অনেক মৌলিক দায়িত্ব ঠিকভাবে পালিত হয়নি।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করেন, স্থানীয় সরকার কাঠামোর অচলাবস্থার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ কিংবা সিটি কর্পোরেশন—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় তদারকির ঘাটতি ছিল। ফলে শহরের নালা-নর্দমা, খাল এবং ড্রেন পরিষ্কার রাখার মতো নিয়মিত কাজগুলো অনেক জায়গায় বন্ধ হয়ে যায়।

রাজধানীতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন নগর বিশ্লেষকরা। মশা নিয়ন্ত্রণের মতো কাজগুলো সাধারণত ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা ও তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে সেই সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় বড় কারণ হলো পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা। নালা-নর্দমা ও ডোবা-জলাশয়ে জমে থাকা পঁচা পানি মশার প্রজননের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে বর্তমানে যে মশার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে তার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এই মশা সাধারণত নর্দমা, ড্রেন বা পচা পানিতে জন্মায়। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন ও ডোবায় জমে থাকা পানি স্থির হয়ে পঁচে গেছে, যা কিউলেক্স মশার দ্রুত বংশবিস্তারকে সহজ করে দিয়েছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শ্যামপুর, রায়েরবাজার ও উত্তরা অঞ্চলে মশার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

সমস্যা আরও বাড়িয়েছে নালা-নর্দমায় জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা। অনেক জায়গায় ড্রেন এতটাই বন্ধ হয়ে গেছে যে সেখানে মশা নিধনের ওষুধ পৌঁছানোই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তৃতীয় কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন—মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদ্ধতির বদলে প্রতীকী পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতা। বাংলাদেশে সাধারণত মশা দমনে ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি আসলে সমস্যার মূল সমাধান নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, ফগিং মূলত পূর্ণবয়স্ক কিছু মশা সাময়িকভাবে কমাতে পারে, কিন্তু মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম কেবল নাগরিকদের সন্তুষ্ট করার প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

উন্নত বিশ্বের বহু দেশ স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে মশা নিয়ন্ত্রণে ফগিংয়ের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। সেখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় মশার লার্ভা ধ্বংস করা এবং প্রজননস্থল নির্মূল করার ওপর।

বাংলাদেশে সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট পাত্র বা টায়ার, ফুলের টব ইত্যাদিতে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত ঘটে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এপ্রিল থেকে বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

বর্তমানে যদিও কিউলেক্স মশার আধিপত্য বেশি, কিন্তু বর্ষা শুরু হলে এডিস মশার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। তখন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ড্রেন, ডোবা, নর্দমা এবং খালের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং সেখানে লার্ভিসাইড ব্যবহার করা জরুরি।

একই সঙ্গে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র বা আবর্জনা পরিষ্কার রাখা না গেলে কেবল সরকারি উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশা নিধনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের ওপর।

মশা দেখতে ছোট হলেও এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব অত্যন্ত বড়। নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য—এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয় ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর মশাবাহিত রোগে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। তাই মশা নিয়ন্ত্রণকে শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে নগর ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

অন্যথায় ‘ঘরে মশা, বাইরে মশা’—এই অভিযোগ হয়তো ভবিষ্যতেও নগরবাসীর প্রতিদিনের বুলি হয়ে যাবে।