জাইমা রহমান
জাইমা রহমান   ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু পরিচয় জন্মসূত্রেই মানুষের কাঁধে এসে বসে। সেই পরিচয় কখনো শক্তি, কখনো বোঝা। জাইমা রহমান এমনই এক নাম, যাঁর পরিচয় বললেই রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া সামনে এসে দাঁড়ায়। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি। কিন্তু এই পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি—এটাই তাঁকে নিয়ে বাড়তে থাকা কৌতূহলের মূল কারণ।

শৈশব, দেশত্যাগ এবং বেড়ে ওঠা

১৯৯৫ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম জাইমা রহমানের। বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালে পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। প্রবাসে কাটে তাঁর কৈশোর ও যৌবনের বড় একটি সময়। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব বাড়লেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর মানসিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি—বরং সময়ের সঙ্গে তা ভিন্ন এক উপলব্ধিতে রূপ নিয়েছে।

পরিচয়ের বাইরে পেশাগত অবস্থান

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও জাইমা রহমান নিজেকে প্রথমে গড়ে তুলেছেন একজন আইনজীবী হিসেবে। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ঐতিহ্যবাহী লিঙ্কনস ইন থেকে ব্যার-অ্যাট-ল’ সম্পন্ন করেন তিনি। আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন জাইমা।

তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা প্রশ্ন তাঁকে বরাবরই ভাবিয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার—এই বিষয়গুলো তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে।

নীরবতা, যা প্রশ্ন তোলে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরব উপস্থিতি অনেক সময় শক্তির মাপকাঠি হলেও জাইমা রহমান এখনো সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় নন। কোনো দলীয় পদ, কর্মসূচি কিংবা বক্তব্যে তাঁকে নিয়মিত দেখা যায় না। কিন্তু এই নীরবতাই তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সচেতন প্রস্তুতি, নাকি সময় নেওয়ার কৌশল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া জাইমা রহমানের কয়েকটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি তাঁর দাদি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাটানো শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন। সেখানে দাদির মমতাময়ী অভিভাবকত্ব, মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার ক্ষমতা থেকেই নেতৃত্বের প্রথম পাঠ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি লেখেন, প্রবাসে দীর্ঘ ১৭ বছর কাটালেও তাঁর হৃদয় ও মন সব সময় বাংলাদেশেই ছিল। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ শুধু জন্মভূমি নয়, বরং দায়িত্ববোধের জায়গা।
এই স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিএনপির কর্মী-সমর্থকের পাশাপাশি সাধারণ নেটিজেনরাও এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

দেশে ফেরা: রাজনীতি নাকি নাগরিক দায়িত্ব?

দীর্ঘদিন পর বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরিবার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই ফেরার ভাবনা। তবে এটিকে এখনই সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং জাইমা রহমান নিজেকে আগে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিতই মিলছে।

সম্ভাবনার নাম

রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আন্তর্জাতিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার সমন্বয়ে জাইমা রহমান এখন এক সম্ভাবনার নাম। তিনি কতটা সামনে আসবেন, কিংবা কীভাবে নিজেকে যুক্ত করবেন—তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, তিনি কেবল পারিবারিক পরিচয়ের ছায়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে চান না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে উত্তরাধিকার প্রায়ই মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে পরিচয়ের বাইরে নিজের পথ নির্মাণের এই চেষ্টা—স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি কাড়ে। জাইমা রহমানের গল্প এখনো চলমান। শেষ অধ্যায় লেখা হয়নি। তবে গল্পের শুরুটা যে কৌতূহল ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।