ফয়জুল করিম
ফয়জুল করিম।   ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি ও জোট গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সব প্রস্তুতি শেষ করে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারণের ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ করেই তা স্থগিত করা হয়। নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর ইসলামী জোট গঠনের এই প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিমের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

জামায়াতপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই ছোট ও মাঝারি ইসলামপন্থী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত নির্বাচনী জোট গঠনের চেষ্টা করছে। এ উদ্দেশ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ একাধিক দলের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক ও যোগাযোগ হয়। তবে আলোচনা যত এগিয়েছে, ততই সংকট গভীর হয়েছে।

জোট আলোচনায় যুক্ত একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভেতরে ফয়জুল করিমের অবস্থান ও বক্তব্যই এই জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জামায়াত-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলনের অতিরিক্ত আসন দাবির কারণেই জোট ঘোষণার সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়।

বিশেষ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকেন্দ্রিক আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থিতার দাবিকে কেন্দ্র করে সংকট আরও প্রকট হয়। দলটির পক্ষে ফয়জুল করিমের দেওয়া একাধিক বক্তব্যকে জামায়াত ও শরিক দলগুলোর নেতারা ‘অসংলগ্ন ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে আগ্রাসী’ হিসেবে দেখছেন বলে সূত্রের দাবি। এতে জোটের অভ্যন্তরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

জামায়াত সূত্র বলছে, আমরা চাই কার্যকর জোট। কিন্তু কেউ যদি জোটের ভেতরে থেকেও আলাদা শর্ত আরোপ করেন, নেতৃত্ব প্রশ্নে আপস না করেন, তাহলে সেটি পুরো প্রক্রিয়াকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।

জোট ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পরপরই জামায়াতে ইসলামীর আমির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করে সবাইকে ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, এই সময়টা জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। কারও ব্যাপারে বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৯ জানুয়ারি। অথচ এই সময় পর্যন্ত ১১ দলীয় ইসলামী জোটে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। ১১ দলের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা চলেছে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগের দিন পর্যন্ত। ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সব দলের সঙ্গে সমঝোতা হলেও ব্যতিক্রম ছিল চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি এককভাবে ২৭২টি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, জামায়াত নিজ দলের জন্য ১৯০টি আসনে প্রার্থী রাখতে রাজি হয়ে শরিকদের জন্য ১১০টি আসন ছাড় দেয়। প্রাথমিক সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে ৪৫টি আসনে এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে ৩০টি আসনে প্রার্থী দেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫টি আসনে, ইসলামী ঐক্যজোট ৬টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৬টি, এবি পার্টি ২টি, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিডিপি) ২টি এবং খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জাগপা একটি করে আসনে দেওয়ার আলোচনা হয়।

তবে সূত্র জানায়, ১১ দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরকষাকষি করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ৩৫টি আসনের প্রস্তাব চূড়ান্ত হলেও দলটি তা মানতে রাজি হয়নি। বরং তাদের দাবি ন্যূনতম ১২০টি আসন। ফয়জুল করিম প্রকাশ্যেই দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলনের ‘এ গ্রেড’ আসন সংখ্যা ১৪৩টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উদ্ধৃতি দিয়ে এমন কথাও ছড়িয়েছে—সম্মানজনক আসন না পেলে জামায়াতকেই জোট থেকে বের করে দেওয়া হবে।

তবে জোটের আরেক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা কোনোদিন সংসদে একটি আসনও পায়নি, তারা কীভাবে দেড়শ আসনের দাবি তোলে—তা বোধগম্য নয়। জোট মানেই ত্যাগ। সেই বাস্তবতা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।