ইসলামী আন্দোলন, ইশতেহার
পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইশতিহার পাঠ করেন চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করিম।   ছবি: আরটিএনএন

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ শিরোনামে এই ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের মৌলিক নীতির প্রয়োগ, পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন, দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং বৈষম্যহীন কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে দলটির আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করিম বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশার উন্মেষ ঘটেছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলনের লক্ষ্যেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ ও হাজারো মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছে। সেই আত্মত্যাগের দায় রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে নতুন পথে পরিচালনার প্রেরণা দিচ্ছে।

তিন অধ্যায়ে ইশতেহার

ইশতেহারটি তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে—রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি।

রাষ্ট্র গঠনে আট দফা নীতিগত অবস্থানের মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতির অনুসরণ, ক্ষমতার চর্চার বদলে দায়িত্ব পালনের ধারণা, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।

ইশতেহারে বলা হয়, সব ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাগরিকদের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা, উৎসব পালনের নিরাপদ পরিবেশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন ও ক্ষমতার ভারসাম্য

রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন চালুর ঘোষণা দিয়েছে দলটি। তাদের মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের অস্থিরতা নিরসনে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। জনপ্রশাসনকে সেবামুখী, দক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।

দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার

ইশতেহারে দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হবে। সরকারি নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

বৈষম্য দূর করতে একটি কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং তৃতীয় লিঙ্গসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

নারী, শ্রমিক ও সামাজিক সুরক্ষা

নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় শরীয়াহভিত্তিক ন্যায়সংগত ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, নারীর কর্মসংস্থান, উত্তরাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের ঘোষণাও রয়েছে ইশতেহারে।

বিশেষ কর্মসূচি ও খাতভিত্তিক পরিকল্পনা

নাগরিকদের জরুরি সেবা নিশ্চিতে ১২ দফা বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হতদরিদ্রদের মাসিক নগদ সহায়তা, শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যকার্ড, যুবদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, জাতীয় জব পোর্টাল এবং নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাস ব্যবস্থা।

এ ছাড়া অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, প্রতিরক্ষা ও স্থানীয় সরকারসহ ২৮টি খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। দলের নেতারা বলেন, এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে একটি উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা।

অনুষ্ঠানের শেষে নেতারা বলেন, ক্ষমতায় গেলে ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তারা দায়বদ্ধ থাকবেন।