গাজা, ফিলিস্তিন, হামাস, ইসরায়েল
গাজায় ফিলিস্তিনি দলগুলোকে নিরস্ত্র করার আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন হামাসের বিদেশের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মেশাল   ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ফিলিস্তিনি দলগুলোকে নিরস্ত্র করার আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন হামাসের বিদেশের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মেশাল। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, দখলদারিত্বের শিকার কোনো জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হলে তারা ‘সহজ শিকারে’ পরিণত হবে এবং তাদের নির্মূল করা সহজ হয়ে যাবে।

রোববার দোহায় অনুষ্ঠিত আল জাজিরা ফোরামের দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য দেওয়ার সময় মেশাল বলেন, হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি মূলত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনকে নিষ্ক্রিয় করার শতবর্ষী প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, “দখলদারিত্ব যেখানে এখনো বহাল, সেখানে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা আমাদের জনগণকে শিকারে পরিণত করবে, যাদের ওপর আন্তর্জাতিক সব ধরনের অস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েল খুব সহজেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে।”

মেশাল আরও বলেন, “আমরা যদি এ বিষয়ে কথা বলতে চাই... তবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে পুনর্গঠন ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে এবং গাজা ও জায়নবাদী সত্তার (ইসরায়েল) মধ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরু না হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে। এটি একটি যৌক্তিক পদ্ধতি। হামাস—কাতার, তুরস্ক ও মিশরের মধ্যস্থতায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে—এ বিষয়ে হামাসের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। হ্যাঁ, এর জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টার প্রয়োজন, তবে তা নিরস্ত্রীকরণের পথে নয়।”

উল্লেখ্য, গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসের ‘পূর্ণাঙ্গ’ নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তা না করলে ফিলিস্তিনি এই দলটিকে কঠোর পরিণতির হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে হামাস সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যতদিন ইসরায়েল গাজা দখল করে রাখবে, ততদিন তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।

গত বছরের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় যে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হয়েছিল, ওয়াশিংটনের মতে তার দ্বিতীয় ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু তথাকথিত এই ‘যুদ্ধবিরতি’ লঙ্ঘন করে ইসরায়েল গাজাজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পূর্ব গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ (একটি অনানুষ্ঠানিক সীমানা, যা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন অর্ধেকেরও বেশি এলাকাকে গাজার বাকি অংশ থেকে আলাদা করেছে) থেকেও সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েল। সর্বশেষ ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৫৪৩ জন আহত হয়েছেন।

মেশাল বলেন, “সমস্যা হামাস বা গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দেওয়া নিয়ে নয়; সমস্যা হলো ইসরায়েল, যারা ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে... তা মিলিশিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়।” সামরিক শাখা ভেঙে ফেলার বিকল্প হিসেবে মেশাল দীর্ঘমেয়াদী শান্ত অবস্থার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “হামাস ৫, ৭ বা ১০ বছরের যুদ্ধবিরতির (truce) প্রস্তাব দিয়েছে। এটিই নিশ্চয়তা যে এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো, যাদের সাথে হামাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তারা এই নিশ্চয়তার জামিনদার হতে পারে।

সংঘাতের মূল কারণ উল্লেখ করে মেশাল বলেন, এই সমস্যার মূলে রয়েছে “দখলদারিত্ব এবং একটি জাতির দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “দখলদারিত্বের অধীনে থাকা মানুষের জন্য প্রতিরোধ একটি অধিকার; এটি আন্তর্জাতিক আইন এবং আসমানি ধর্মগুলোর স্বীকৃত অংশ। প্রতিরোধ জাতিসমূহের স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

‘ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হতেই হবে’
খালেদ মেশাল বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ছিল একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। গাজার এই সংঘাত বিশ্বকে ফিলিস্তিন ইস্যুর ‘দ্বিতীয় প্রশ্ন’ বা মূল সমস্যাটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের সেই হামলাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “[অপারেশন আল-আকসা] ফ্লাড এবং এই গণহত্যামূলক যুদ্ধ বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ফিলিস্তিন সমস্যার একটি সমাধান অবশ্যই হতে হবে।” ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা বাড়াকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “১৫৯টি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে অনুমোদন বা স্বীকৃতি দিয়েছে, এটি ভালো, তবে যথেষ্ট নয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আমরা কীভাবে বাস্তবে রূপ দেব? ফিলিস্তিনি, আরব, মুসলিম এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের বন্ধুদের কাছে এখন এটিই বড় প্রশ্ন।”

মেশাল আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে কূটনৈতিক অঙ্গনে ‘রক্ষণাত্মক নীতি’ থেকে বেরিয়ে ‘আক্রমণাত্মক’ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে চাই যে, তারা (ইসরায়েল) একটি একঘরে সত্তা এবং নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের জন্য বোঝা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের মতো এদেরও আন্তর্জাতিক বৈধতা পুরোপুরি শেষ করে দিতে হবে।” মেশাল শেষে বলেন, “আমরা একটি ন্যায়সংগত দাবির পক্ষে, আর অভিযুক্ত তারাই যারা গণহত্যার মতো যুদ্ধাপরাধ করেছে।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই