কর্মসূচি
ছাত্রশিবিরের তীব্র ও প্রতিবাদ।   ছবি: আরটিএনএন

রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তবে এ হামলায় এবি পার্টিও নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এই ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র ও প্রতিবাদ জানান।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, গতকাল থেকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা জাতিসংঘের অধীনে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। 

আজ বিকেল ৪টার দিকে কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই পুলিশ অতর্কিতভাবে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিপেটা করে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার এবং ঢাবি শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ অনেকেই গুরুতর আহত হন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের দাবিতে পরিচালিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের এই আক্রমণাত্মক ভূমিকা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং এটি পুরোনো ফ্যাসিবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ছাত্র-জনতা যে ফ্যাসিবাদকে রক্ত দিয়ে বিদায় করেছে, পুলিশ আজ সেই একই কায়দায় রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে প্রমাণ করেছে যে, তারা এখনো ফ্যাসিবাদের সেবাদাস হিসেবেই কাজ করছে।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার বিচারের ব্যাপারে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণার সময় গত ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৫৬ দিন পার হলেও মামলার কোনো যৌক্তিক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

উপরন্তু, মামলার শুনানি ইতোমধ্যে ৫ বার পেছানো হয়েছে, যা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও রহস্যজনক আচরণকেই স্পষ্ট করে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর গঠিত সরকারের আমলে যদি বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোকে রাজপথে মার খেতে হয়, তবে এই সরকারের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংগত। প্রশাসনের এই গড়িমসি এবং খুনিদের মদদ দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।”

পরিশেষে নেতৃবৃন্দ জোর দাবি জানিয়ে বলেন, শহীদ ওসমান হাদির বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো আধিপত্যবাদী চক্রের গভীর ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা জাতিকে জানাতে হবে। অবিলম্বে আজকের হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ইনকিলাব মঞ্চের উত্থাপিত যৌক্তিক দাবিগুলো অবিলম্বে মেনে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওসমান হাদি হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আজকের হামলায় আহত নেতাকর্মীদের দ্রুত সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করছি এবং সরকারকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিচ্ছি যে, অবিলম্বে দমন-পীড়ন বন্ধ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করলে ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।

এদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং শতাধিক আন্দোলনকারীর আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। 

বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাতিসংঘের অধীনে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাত্রারত নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকারকে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারসেল, বুট ও গুলির মাধ্যমে দমন করার ঘটনা নিন্দনীয়। 

তিনি আরও বলেন, পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণের ফলে যেভাবে সাধারণ আন্দোলনকারীরা আহত হয়েছেন, তা ন্যক্কারজনক। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং অন্যান্য নেতাকর্মীদের মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। 

তিনি বলেন, অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, সব সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অন্যায়, জুলুম ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এবং ভবিষ্যতেও ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশে থাকবে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই দমননীতি পরিহার করে জনগণের ন্যায্য দাবি শোনার পথ বেছে নিতে হবে।

তাছাড়া, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং রাকসুর জিএস আম্মারসহ প্রায় ৩০ জন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে আহত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি)।

শুক্রবার শান্তিপূর্ণভাবে বিচার দাবিতে আন্দোলনরত ইনকিলাব মঞ্চের ডাকসু নেত্রী জুমা, জকসু নেত্রী শান্তাসহ ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীদের ওপর পুলিশের বুট দিয়ে পিষে দেওয়া, নির্বিচারে হামলা চালানো এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। বেদনার বিষয় হলো,হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শেষ পর্যন্ত তার সহধর্মিণীকে ১০ মাস বয়সী এতিম শিশুকে কোলে নিয়ে রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে । 

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, হাদি হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় চার্জশিট নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। বিচার দ্রুত নিশ্চিতের দাবিতে যখন তার সহযোদ্ধারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন, তখন তাদের ওপর হামলা চালানো চরম ন্যাক্কারজনক ও গণতন্ত্রবিরোধী। এ ধরনের হামলা প্রমাণ করে,একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।

নেতৃদ্বয় আরও বলেন, গুলি চালিয়ে, হামলা করে কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে হাদির বিচার দাবিকে স্তব্ধ করা যাবে না। গুলিবর্ষণের মাধ্যমে হাদির বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।

এবি পার্টি অবিলম্বে হামলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। পাশাপাশি হাদি হত্যার বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।

এবি পার্টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা নির্যাতিতদের পাশে থাকবে এবং যে কোনো অন্যায়, জুলুম ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার থাকবে।