আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। “করবো কাজ, গরব দেশ”গড়ার প্রত্যয়ে প্রণীত এই ইশতেহারের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে— “সবার আগে বাংলাদেশ”।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার তুলে ধরেন। এটি তার নেতৃত্বে ঘোষিত প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপি তাদের ইশতেহারকে মোট ৫টি ভাগে বিভক্ত করেছে এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য ৫১টি দফা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির ওপর।
৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে বিএনপি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে ৯টি মূল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রথমত, জনগণের জন্য পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এবং সহায়তার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। মৎস্য ও পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারাও এ সুবিধা পাবেন।
তৃতীয়ত, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থত, বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া হবে এবং ‘মিড-ডে মিল’ কার্যক্রম চালু করা হবে।
পঞ্চমত, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠত, খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সপ্তমত, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালুর কথাও বলা হয়েছে।
অষ্টমত, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
নবমত, ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারের প্রধান ৫টি অধ্যায়
বিএনপির ইশতেহার পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে।
প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার ও সুশাসন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সাংবিধানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সামাজিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসন বিষয়ে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং শ্রমিক কল্যাণের অঙ্গীকার রয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য। বিএনপি বলছে, তারা ক্ষমতায় গেলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ করবে এবং বিনিয়োগ ও এফডিআই বৃদ্ধি, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেবে।
চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ। চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং উত্তরাঞ্চল, হাওর-বাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির বক্তব্য ও রাজনৈতিক গুরুত্ব:
ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি জানিয়েছে, এটি কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয় বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’। দলটির মতে, তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয় বরং ন্যায় ও মানবিকতায় বিশ্বাসী।
বিএনপি আরও বলেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে— লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার এবং বৈষম্য নয় ন্যায্যতা। জনগণের রায়ে ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি।
উল্লেখ্য, এর আগে পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দশম ও দ্বাদশ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করেছিল। সেই হিসেবে এবারের ইশতেহার ঘোষণা তারেক রহমানের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক মাইলফলক।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!