এআই দখলের দৌড়ে হাজার কোটি ডলারের বাজি, শেষ হাসি কার?
এআই দখলের দৌড়ে হাজার কোটি ডলারের বাজি, শেষ হাসি কার?   ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে শুরু হয়েছে এক ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতা কে কত বেশি অর্থ ঢালতে পারে, যেন সেটাই হয়ে উঠেছে ক্ষমতার মাপকাঠি। এই ব্যয়বহুল দৌড়ে আপাতত সবার সামনে রয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যামাজন ও গুগল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই এই দুই প্রতিষ্ঠানের এআই-সংক্রান্ত বিনিয়োগ কয়েক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। লক্ষ্য একটাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি দুনিয়ায় নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করা। তবে প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল বিনিয়োগের ফল ভোগ করবে কে?

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্রাঞ্চের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একদিকে যখন বড় কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের ‘হাই-এন্ড কম্পিউটিং শক্তি’ দখলের জন্য মরিয়া, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা এই লাগামছাড়া খরচ দেখে শঙ্কিত। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আর আর্থিক মুনাফার এই টানাপোড়েনই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

ব্যবসার মূল সূত্র সাধারণত খরচ কমিয়ে আয় বাড়ানো। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম যেন উল্টো পথে হাঁটছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিশ্বাস এখন বেশি খরচ না করলে ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে। এই দর্শনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে অ্যামাজন।

সম্প্রতি প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে অ্যামাজন জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তারা প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার মূলধন ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এই অর্থ ব্যয় হবে এআই অবকাঠামো, নিজস্ব চিপ, রোবোটিক্স ও নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে। যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তবে এই পুরো ব্যয় এআইয়ের জন্য নয়। অ্যামাজনের বিশাল গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করতে বিপুল সংখ্যক রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা ব্যয়ের বড় অংশ জুড়ে আছে।

এআই দৌড়ে গুগলও পিছিয়ে নেই। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের মূলধন ব্যয় দাঁড়াতে পারে সাড়ে ১৭ হাজার থেকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি ডলারে। আগের বছরের তুলনায় এই অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ। স্থায়ী সম্পদে গুগলের এই ব্যয় ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক কোম্পানিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

অন্যদিকে, মেটা জানিয়েছে ২০২৬ সালে তারা প্রায় সাড়ে ১১ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। ওরাকলের লক্ষ্যমাত্রা তুলনামূলক কম প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার। মাইক্রোসফট এখনো আনুষ্ঠানিক বাজেট ঘোষণা না করলেও বর্তমান ব্যয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বছর শেষে তাদের খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারে।

এই লাগাতার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বাড়ছে। বড় অংকের বিনিয়োগ ঘোষণার পরপরই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে চাপ পড়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বেশি খরচের ঘোষণা দিয়েছে, তাদের শেয়ারমূল্য কমার প্রবণতাও বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সম্পদ হবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসিং শক্তি। তখন কেবল তারাই টিকে থাকবে, যাদের হাতে নিজস্ব কম্পিউটিং অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা থাকবে।

তবে বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা সত্ত্বেও এই দৌড় থামার কোনো ইঙ্গিত নেই। কারণ এআই যে আগামী দিনের প্রযুক্তি ও ব্যবসার ধরন পুরোপুরি বদলে দেবে সে বিষয়ে বড় টেক কোম্পানিগুলো প্রায় নিশ্চিত। শেয়ারবাজারের অস্থিরতার কারণে এই দৌড় থেকে সরে আসা তাদের কাছে বাস্তবসম্মত নয়।

তবে সামনের দিনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের এআই উচ্চাকাঙ্ক্ষার খরচ আরও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সিমু/আরটিএনএন