নোবিপ্রবি, শিক্ষা, অর্থ, আত্মস্বাৎ,
সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খান।   ছবি: আরটিএনএন

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

বিভাগের একাধিক আর্থিক অসঙ্গতির কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফিল্ড ট্যুর সংক্রান্ত অর্থ নিয়ে জটিলতায় বিভাগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের বিলসহ বিভাগের একাধিক পাওনা তিনি এখনো পরিশোধ করেননি। ফলে শিক্ষকরা ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর অভিযোগপত্র দেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্য বরাবর সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিবের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ১১টি লিপিবদ্ধ অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ৫ কার্যদিবসের মধ্যে দৃশ্যমান তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হানিফ মুরাদকে আহ্বায়ক এবং ড. আবিদুর রহমানকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

মার্ক টেম্পারিংয়ের অভিযোগের সত্যতা নিরূপণের জন্য একই বছরের ৪ নভেম্বর নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হককে আহ্বায়ক এবং বিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন ড. আতিকুর রহমান ভুঁইয়া ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমকে সদস্য করে পৃথক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়।

কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও উভয় কমিটির কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি বলে জানা গেছে। এতে বিভাগের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফিল্ড ট্যুর সংক্রান্ত অর্থ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর্থিক বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য গত ১ মার্চ অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে নতুন আরেকটি কমিটি গঠন করেছে এবং আগামী ৯ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

একজন শিক্ষককে নিয়ে পরপর তিনটি কমিটি গঠন করেও সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, “নাজমুস সাকিব স্যারের বিরুদ্ধে মার্ক টেম্পারিং, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ছাড়াই অযাচিত নম্বর প্রদান, বিভাগের অর্থ জালিয়াতিসহ নির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ করা হয়েছে।

স্যারের কারণে বর্তমানে আমাদের সেমিস্টার সময়মতো হচ্ছে না, যা আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এমনকি তার অর্থ জালিয়াতির কারণে আমাদের ৪র্থ বর্ষের ১ম সেমিস্টারের (৪/১) ফিল্ড ট্যুরের ক্ষেত্রেও আমরা বিভাগীয় পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তখন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো কোনো বিচার হয়নি।”

এ বিষয়ে বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফা বলেন, “বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুস সাকিবকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও পরীক্ষা আয়োজন সংক্রান্ত কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। এতে বিভাগে নতুন করে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিভাগের নিজস্ব একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অন্তত তিনটি ব্যাচের (৫-৩, ৫-১ এবং ২-১) চলমান সেমিস্টার পরীক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্য থাকলেও দুর্ভাগ্যবশত তা শেষ করা যাচ্ছে না।

বিগত প্রশাসনের সময় অর্থের অসঙ্গতির অভিযোগ দেখিয়ে বিল আটকে রাখা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।”

এছাড়া একটি চেকের টাকা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “দায়িত্ব ছাড়ার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অবৈধভাবে একটি চেকের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা বিভাগীয় অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করেন। এ বিষয়ে বারবার চিঠি, ই-মেইল কিংবা ফোনে যোগাযোগ করা হলেও এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। এছাড়া তার সময়ে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ট্যুরের অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। হিসাববহির্ভূত আরও কিছু আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ২০১৮–১৯, ২০১৯–২০, ২০২০–২১, ২০২১–২২ ও ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষসহ কয়েকটি সময়ের আর্থিক অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ আমি চেয়ারম্যান ছিলাম মাত্র দুটি শিক্ষাবর্ষে।

ওই সময় ড. গোলাম মোস্তফা, ড. আব্দুল মোমিন সিদ্দিকী এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রিমনও চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু তাদের হিসাব সমন্বয় না করে শুধু আমার কারণে এসব হিসাব আটকে আছে বলে দোষারোপ করা হচ্ছে। আমি বলেছি, সব হিসাব সঠিকভাবে সমন্বয় করার পর যদি কোনো টাকা আমার কাছে পাওনা থাকে, তাহলে আমার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হোক—তবে বিভাগের কাজ যেন আটকে না থাকে।”

দেড় লাখ টাকার চেকের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দেড় লাখ টাকার একটি চেক তুলেছিলাম। আমি বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা স্যারকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, বিভাগে নাকি কোনো কিছুই নেই।

আমি তখনও বলেছি, যদি আমার কাছ থেকে কোনো টাকা পাওনা থাকে তাহলে আমি বিভাগে এসে কাগজপত্র দেখে তা পরিশোধ করে দেব। কিন্তু কিছু না শুনেই হয়রানিমূলক আচরণ করা ঠিক নয়।”

এ বিষয়ে গঠিত সর্বশেষ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, “শুধুমাত্র আর্থিক বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা আগামী রোববার এ বিষয়ে বসে সিদ্ধান্ত জানাবো। আগের তদন্ত কমিটিগুলো কোনো প্রতিবেদন দিয়েছে কি না—সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।”

অন্যদিকে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাঈল বলেন, “নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ আসার পর আমরা একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”