ঈদ শুভেচ্ছা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।   ছবি: আরটিএনএন

যান্ত্রিক যুগে ফিকে হয়ে যাওয়া শৈশবের ঈদের রঙিন স্মৃতি

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আকাশের বুকে জেগে উঠা এক ফালি বাঁকা চাঁদ মুসলিমদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঈদের বার্তা ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ঈদের আগমন মুসলিমদের জন্য খুশি ও আনন্দের। এজন্যই বলা হয় ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি।

তবে যান্ত্রিকতার এই যুগে ঈদ এখন অন্যরকম। হাতে হাতে ঈদ কার্ড বিতরণের আড়ম্বর এখন বিলুপ্ত। আধুনিকায়নে ঈদ কার্ড এখন অনলাইন ভিত্তিক, সেই সাথে সালামিটাও। ঈদের কাটে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসে, ছবি আপলোড, টিভি বা ফোনে স্ক্রোলিং এর মাধ্যমে। অনেকের ঈদের ব্যস্ত সময়টা ঘুম, খাওয়া আর ফোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। 

তবে আমরা যারা নব্বই দশক বা এর আশেপাশের আমাদের শৈশবের ঈদ আমাদের কাছে অতি প্রিয় স্মৃতি। শৈশবের সেই আনন্দঘন ঈদের স্মৃতি আর বর্তমানের যান্ত্রিক ঈদের যাতাকলে পিষ্ট হওয়া অনুভূতিগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা। 

২০২১-২২সেশনে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসাইন এর ঈদ অনুভূতি 

‘সময়ের আর্বতে ঈদ আনন্দ অনেকটা পানসে’

দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে নিয়ে আসে অনাবিল আনন্দ, প্রশান্তি ও হৃদয়ভরা এক নির্মল সুখের আবেশ। ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস আর অপেক্ষার মধুর অনুভূতি। নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ, আকাশে রূপালি ঈদের চাঁদ দেখার সেই উচ্ছ্বসিত মুহূর্ত এবং ঈদের সকালে ভোরে ঘুম ভেঙে ওঠার সেই ব্যাকুলতা, সবকিছু মিলিয়ে ঈদ ছিল হৃদয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও প্রিয় উৎসব। ছোট ছোট বিষয়েই তখন মন ভরে যেত সীমাহীন আনন্দে। সময়ের প্রবাহে আজ সেই অনুভূতির রঙ কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। এখন নতুন পোশাকের প্রতি আগের মতো তেমন আগ্রহ আর নেই, অনেকটা নীরবতা আর আলসেমির মাঝেই ঈদের দিনটি কেটে যায়। তবু হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা শৈশবের সেই নির্মল ঈদের স্মৃতিগুলোই আজও নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয় ঈদের প্রকৃত আনন্দ কতটা নির্মল ও গভীর।

২০২১-২০২২ সেশনে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী আনিকা আঞ্জুম এর ঈদ উপলব্ধি

বর্তমানে ঈদের আনন্দ কিছুটা ভিন্ন

শৈশবে ঈদ ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। আমরা অধীর আগ্রহে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার অপেক্ষা করতাম। ঈদের আনন্দ শুরু হতো নতুন জামা কেনা, মেহেদি দেওয়া এবং নানা প্রস্তুতির মাধ্যমে। সকালে খুব তাড়াতাড়ি উঠে নতুন কাপড় পরতাম, ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম এবং সারা দিন বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা ও আত্মীয়দের বাড়িতে ঘুরতে যেতাম। বড়দের কাছ থেকে সালামি পাওয়া এবং নানা রকম মজার খাবার খাওয়া ছিল সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কিন্তু বর্তমানে ঈদের আনন্দ কিছুটা ভিন্ন লাগে। এখন ঈদ অলসেমিতে কেটে যায়। আগে যেমন খুব ভোরে উঠতাম, এখন অনেক সময় দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। এখন বাড়িতে আরাম করে সময় কাটাতে ভালো লাগে। নতুন কাপড় পরা ও ভালো খাবার খাওয়ার আনন্দ এখনও আছে, তবে আগের মতো এত ঘোরাঘুরি বা দৌড়ঝাঁপ করা হয় না। এখন ঈদের দিনটা পরিবারের সাথে শান্তভাবে কেটে যায়।

২০২১-২২ সেশনে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী সুমাইয়া এর ঈদ, শৈশবে ফিরে যাওয়ার তৃপ্তি

যদি ঈদের দিন ইন্টারনেট কাজ না করতো

ঈদ মানেই শৈশবের অনেক রঙিন স্মৃতি । ঈদ শুরুই হতো নতুন জামা কেনা থেকে। ঈদের আগের দিন দাদা বাড়ি যাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। ইফতারের পর আকাশে ঈদের চাঁদ খোঁজা,বোনদের সাথে হাতে মেহেদী লাগানো, সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করার সংকল্প,কিন্তু ঘুম সব বানচাল করে দিত। এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই জমজমাট ছিলো ঈদের আমেজ। ঈদের সকালে নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সেই আনন্দ যেন ছিল আলাদা এক সুখ। দাদার আতরের ঘ্রান,সালামি  আর দাদীর হাতের সেমাই দিয়ে ঈদের দিন শুরু করতাম আমরা। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেছে। আমরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। এখন ঈদ আসে নীরবে। নতুন জামা নিয়েও আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই, হাতে মেহেদী লাগানোর জন্য আগের মতন সেই উত্তেজনা নেই। ঈদের দিন এখন বড্ড আলসেমিতে কেটে যায়। কাকার কাছে আর আবদার করা হয়না। মাঝে মাঝে মনে হয়, বড় কেন হলাম,ছোটই তো ভালো ছিলাম। পড়াশোনার কোনো টেনশন ছিল না, ছিল না কোনো ফোন। ইশস,যদি এমন হতো,ঈদের দিন সবধরনের ইন্টারনেট আর কাজ করবে না, তাহলে হয়ত সেই ছোট্ট বেলার মতন ঈদ উদযাপন করা যেত।

২০২১-২০২২ সেশনে কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী তামজিদ হাসান সাওম এর ঈদ বিলাসিতা 
 
ঈদ এখন কেবলই একটু লম্বা ছুটির নাম

ছোটবেলার ঈদ মানেই এক রাশ অবারিত আনন্দ আর সারল্য। তখন ঈদের আনন্দ শুরু হতো চাঁদরাত থেকেই। নতুন জামা বালিশের নিচে রেখে ঘুমানো, বারবার তা বের করে দেখার মাঝেও আনন্দ ছিল। সকালে ঈদগাহে যাওয়ার ধুম,আতরের ঘ্রাণ আর নামায শেষে সালামি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠা। সেই সেলামির টাকা জমিয়ে রাখা হতো মাটির ব্যাংকে। বিকেলে মেলায় যাওয়া কিংবা পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিগুলো আজও অমলিন। সে সময় ঈদ মানে শুধু উৎসব ছিল না, ছিল সবার সাথে মিলেমিশে থাকা আর পরম তৃপ্তির এক রঙিন অধ্যায়। বর্তমানের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈদের সংজ্ঞাটাও বদলে গেছে। এখন আর সালামি পাওয়ার অপেক্ষা থাকে না, বরং ছোটদের হাতে সালামি তুলে দেওয়ার মাঝেই আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। এখন ঈদের অনেকটা সময় কাটে ফোনের স্ক্রিনে। ছবি তোলা, স্ট্যাটাস দেওয়া আর দূরে থাকা বন্ধুদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলাটাই এখনকার প্রথা। কর্মব্যস্ত জীবনে ঈদ এখন অনেকের কাছে কেবলই একটু লম্বা ছুটির নাম। বন্ধু-বান্ধবের বাসায় যাওয়ার চেয়ে ঘরে বসে একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেওয়াটাই এখন বড় বিলাসিতা।