ভোটকেন্দ্র, নির্বাচন
নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কোনো কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বাতিল ঘোষণার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।   ছবি: সংগৃহীত

নানা অনিয়ম, সহিংসতা কিংবা ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে পারে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন—কোনো কেন্দ্রের ভোট বাতিল হওয়া মানেই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়া। সে ক্ষেত্রে ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের অভিযোগ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় কমিশনকে। প্রয়োজন হলে পুরো আসনের ভোটও স্থগিত বা বাতিল করা যেতে পারে।

নির্বাচন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কোনো কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বাতিল ঘোষণার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভোটের স্বচ্ছতা নষ্ট হলে বা ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার মতো অনিয়ম প্রমাণিত হলে ভোট বাতিল ছাড়া বিকল্প থাকে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটকেন্দ্র দখল, মারামারি, ককটেল বা বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ, ব্যালট ছিনতাই কিংবা ভাঙচুরের মতো সহিংস ঘটনার কারণে অনেক সময় ভোটগ্রহণ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে ভোট স্থগিত করতে পারেন। পরে তদন্ত শেষে অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।

ব্যালট পেপার নষ্ট বা হারিয়ে গেলে ভোটের সঠিকতা নিশ্চিত করা যায় না। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল গ্রহণযোগ্য থাকে না। এ ছাড়া বুথ দখল করে একযোগে জালভোট প্রদান, একজনের একাধিকবার ভোট দেওয়া কিংবা সংঘবদ্ধ কারচুপি ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচনের পরিপন্থি। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভোট বাতিল করা হয়।

ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া, হুমকি বা জোরপূর্বক ভোটদানে প্রভাব বিস্তারও ভোট বাতিলের কারণ হতে পারে। এসব ঘটনায় ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এবং ভোটগ্রহণের পরিবেশ নষ্ট হয়।

কখনো কখনো প্রিসাইডিং অফিসার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, ইচ্ছাকৃত ত্রুটি, ফলাফল পরিবর্তন বা নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে। কর্মকর্তার কারচুপি প্রমাণিত হলে ওই কেন্দ্রের ভোট বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে।

প্রযুক্তিগত ত্রুটিও বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যালট পেপার ভুল ছাপা, সিল বা ভোটগ্রহণের সরঞ্জামে সমস্যা, ইভিএম বিকল হওয়া কিংবা ডেটা গরমিলের কারণে ভোট স্থগিত বা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে অতীতেও।

এ ছাড়া কোনো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভোটার ও কর্মকর্তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে তখন ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কর্মকর্তাদের। কোনো প্রার্থীর অভিযোগ বা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ভোট বা ফলাফল স্থগিতের নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা আসনের ভোটও বাতিল বা স্থগিত হতে পারে।

বাড়তি সতর্কতা

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে বাড়তি নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় জোরদারের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্র যেন বাতিলের পরিস্থিতি তৈরি না হয়—সে লক্ষ্যেই সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার আট লাখের বেশি সদস্য নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া যদি কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত বা ‘ইন্টারাপ্টেড’ হয়ে যায় এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে স্বাভাবিকভাবে ভোট পুনরায় শুরু করা সম্ভব নয়, তাহলে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব হলো তাৎক্ষণিকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা।

তিনি বলেন, সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা কারিগরি সমস্যার কারণে যদি এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ভোট বন্ধ থাকে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক করা না যায়, তাহলে ভোটের ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ভোট চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সেটি বন্ধ করে দিতে হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং অফিসার বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে রিটার্নিং অফিসারকে জানাবেন। পরে রিটার্নিং অফিসার তদন্ত করে প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। কমিশন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে ওই কেন্দ্রে পুনরায় ভোট বা নতুন তারিখে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে।

ইন্টারাপশনের কারণ বিভিন্ন হতে পারে উল্লেখ করে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা এমন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি—যেখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়—এসব ক্ষেত্রে ভোটের পবিত্রতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন সেটিকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি সিচুয়েশন’ হিসেবে বিবেচনা করে ভোট বন্ধ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দায়িত্ব শুধু ভোট চালু রাখা নয়, বরং সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে ভোট বন্ধ করে কমিশনকে অবহিত করাই আইনসম্মত পদক্ষেপ।