নির্মাতা,  চিত্রশিল্পী, আফজাল হোসেন, ফেসবুক, কাজী জহির, ‘নতুন বউ’,
নন্দিত অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন   ছবি: সংগৃহীত

ন্দিত অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন। অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখিতেও সমানভাবে সক্রিয় তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝে মধ্যেই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সময় ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গভীর ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি শেয়ার করেছেন তার শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলার একান্ত ব্যক্তিগত গল্প।

লেখায় আফজাল হোসেন জানান, তিনি গ্রাম থেকে শহরে আসা একজন তরুণ, যার স্বপ্ন ছিল আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার। কয়েকশো পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জনকে নেয়া হবে—এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও তার আত্মবিশ্বাস ছিল, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি ভালো আঁকেন। তবে সেই সময় ফিরে তাকালে তার মনে প্রশ্ন জাগে—ভর্তি পরীক্ষায় মেধার চেয়ে যদি ক্ষমতাবান কারও প্রভাব বেশি প্রয়োজন হতো, তাহলে কি তাকে আবার ফিরে যেতে হতো পারুলিয়ার ছেলে হয়ে পারুলিয়াতেই?

ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি লেখেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন নিয়মিত। কলেজের লিচুতলা কিংবা হোস্টেলের আঙিনায় গোল হয়ে বসে বন্ধুদের কবিতা শোনানো ছিল নিত্যদিনের আনন্দ। পাশের ঘরের ছোট ক্লাসের ছাত্র উত্তম দে কবিতার সঙ্গে গিটার বাজাত। সেই সময় মানুষ অবসর পেলে আগ্রহ নিয়ে কবিতা শুনত—এমন এক সময়ের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, কলেজে সক্রিয় রাজনীতি না থাকলেও ছাত্র সংসদ ছিল। ভালো কবিতা আবৃত্তি করার সুবাদে তাকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক করা হয়। কলেজের রজতজয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নেন তিনি। শিক্ষক নবী স্যার ও রফিকুন্নবী স্যারের অনুমতিতে শুরু হয় নাটকের প্রস্তুতি। যদিও সেই নাটকে তার অভিনয় করার কথা ছিল না, পরিস্থিতির কারণে তাকেই মঞ্চে নামতে হয়।

নাটক শেষে এক অচেনা মানুষ এসে তাকে অভিনয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন এবং ঢাকা থিয়েটারে রিহার্সালে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। পরে জানা যায়, সেই মানুষটি ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, যিনি বাচ্চু নামেই বেশি পরিচিত। তার আহ্বানেই ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন আফজাল হোসেন।

অভিনেতা হওয়ার কোনো পূর্ব ইচ্ছা না থাকলেও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি পেয়েছিলেন অসাধারণ সব মানুষের সান্নিধ্য। একই বছরে টেলিভিশনের কিংবদন্তি নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা আবদুল্লাহ আল মামুন তাকে ডেকে পাঠান টেলিভিশনে অভিনয়ের জন্য। তখন তাদের দুটি দল ছিল পরস্পরের মঞ্চপ্রতিদ্বন্দ্বী। আফজাল হোসেন লেখেন, আজ ভাবলে অবাক লাগে—যদি তখন দলগত গোষ্ঠীপ্রীতি কাজ করত, তাহলে কি সেই সুযোগ পাওয়া সম্ভব হতো?

সিনেমায় অভিনয় নিয়েও তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু দেশের অন্যতম সফল প্রযোজক-পরিচালক কাজী জহির তাকে ‘নতুন বউ’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। মঞ্চ ও টেলিভিশনের একজন অভিনেতাকে সিনেমায় সুযোগ দেওয়াটা তার কাছে ছিল বিস্ময়কর এবং অত্যন্ত মূল্যবান এক প্রাপ্তি।

লেখার শেষাংশে আফজাল হোসেন সময় ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গভীর উপলব্ধির কথা বলেন। তার মতে, কখনো মানুষ সময়কে মূল্যবান করে তোলে, আবার কখনো সময়ই মানুষকে মূল্যবান হয়ে ওঠার সুযোগ দেয়। জীবনে অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প রয়েছে, এখনও মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। পৃথিবী, দেশ ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি উৎসাহ ও আনন্দ নিয়েও মানুষ একে অপরের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।

তিনি মনে করেন, মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়িয়ে থাকার সেই পুরোনো নিয়ম আজও পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে টিকে আছে—শুধু বদলে গেছে লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য।