সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল, কমল এসডিএফ সুদহার ।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল, কমল এসডিএফ সুদহার ।   ছবি: আরটিএনএন

২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি–জুন) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পূর্বের মতোই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক রাখা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদহার কমানো হয়েছে।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।

ঘোষিত নীতিতে নীতিনির্ধারণী সুদহার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে এসডিএফ সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, নীতিসুদহার অপরিবর্তিত রাখার প্রধান কারণ হলো এখনো উচ্চ অবস্থানে থাকা মূল্যস্ফীতি। নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহ সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বাজারের অদক্ষতার কারণে মূল্যস্ফীতি কমার গতি মন্থর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই মুহূর্তে নীতিসুদহার কমানো হলে টাকার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আবারও জোরালো হতে পারে। সামনে জাতীয় নির্বাচন, রমজান মাস এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কঠোর মুদ্রানীতি, সরকারের ঋণ চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণের ফলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তৈরি হয়েছে, যা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পমূল্যের ঋণপ্রাপ্তিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

তবে এসডিএফ সুদহার কমানোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা না রেখে আন্তঃব্যাংক বাজার ও উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ দিতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বড় অঙ্কের মূলধন পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। তবে ২০২৫ সালে আমানত প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আমানত প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছেছে।

এদিকে আমানত বাড়ার পাশাপাশি ‘ফ্লাইট টু কোয়ালিটি’ প্রবণতাও জোরালো হয়েছে। আমানতকারীরা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করছেন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা কঠোর হিসাব ও শ্রেণিকরণ নীতির ফল বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মুদ্রানীতিতে আরও জানানো হয়, বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০২৪ সালে সৃষ্ট ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধ বকেয়া নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংক ও ঋণদাতাদের আস্থা ফিরেছে। প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহে চলতি হিসাব ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি না করে বরং আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি ও কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রভিশনিং শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন জোরদারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না এবং লোকসানি ব্যাংকে কর্মকর্তাদের বোনাসও স্থগিত থাকবে।