বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।   ফাইল ছবি

বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, রাজনৈতিক উত্তাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্যাংক খাতে আমানতের জোয়ার বইছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংকাররা বলছেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফেরার মতো কয়েকটি কারণ এ প্রবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ অঙ্ক ছিল ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ২১০ কোটি টাকা।

এটি গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এর আগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। টানা ১৭ মাস এক অঙ্কের ঘরে থাকার পর গত বছরের আগস্টে আবার দুই অঙ্কে ওঠে আমানতের প্রবৃদ্ধি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু ডিসেম্বর মাসেই ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। নভেম্বরে বৃদ্ধি ছিল আরও বেশি—প্রায় ২৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা।

নভেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ। অক্টোবর শেষে ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং আগস্টে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। এর আগে সর্বশেষ দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তখন হার ছিল ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে আমানতের যে গতি দেখা গেছে, তা ব্যাংক খাতের জন্য স্বস্তির বার্তা। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার সঞ্চয়কারীদের ব্যাংকমুখী করেছে।

বিগত সরকারের সময়ে নানা অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের চিত্র সামনে আসে। এতে গ্রাহকদের একাংশ আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখান, নতুন আমানতও কমে যায়।

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুদের হার বৃদ্ধি, তদারকি জোরদার ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। শক্ত ভিত্তি ও তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরটিএনএনকে বলেন, উচ্চ সুদের হার সঞ্চয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় মানুষের ব্যয়ের চাপ হালকা হয়েছে। নিরাপত্তার বিবেচনায়ও অনেকেই নগদ অর্থ ঘরে না রেখে ব্যাংকে জমা রাখছেন। বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধিও আমানত বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে আমানতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা রয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। টানা আট মাস ধরে এ হার ৬ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হার—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে ঋণ চাহিদা বাড়ছে না।

তাদের মতে, আমানত বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে স্থায়ী করতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে আমানতের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও কার্যকর তদারকি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।