খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাত
বাংলাদেশ ব্যাংক।   ছবি: আরটিএনএন

খেলাপি ঋণের ভারে নাজুক হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংক খাত। এই চাপের মধ্যেই বাড়ছে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৬১টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা।

ঋণের ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্ধারিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও পর্যাপ্ত পরিচালন মুনাফা না থাকায় অধিকাংশ ব্যাংক তা রাখতে পারছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই কমা মূলত নীতিগত সুবিধার ফল। ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় অনেক শ্রেণিকৃত ঋণ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি কমেনি।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে প্রভিশন রয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। অথচ প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।

খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বেসরকারি ব্যাংকে। এসব ব্যাংকে প্রয়োজন ছিল ৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা, কিন্তু সংরক্ষিত আছে ২ লাখ ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন থাকার কথা ছিল ১ লাখ ২৭৭ কোটি টাকা। সেখানে সংরক্ষিত আছে মাত্র ২৯ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি ৭০ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা, কিন্তু সংরক্ষিত রয়েছে ২ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ৩৩৮ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ১৩ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সেখানে সংরক্ষিত আছে ১৩ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২০১ কোটি টাকা।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রভিশন ঘাটতি বাড়তে থাকলে ব্যাংকের মূলধনের ওপর বড় চাপ পড়ে। এতে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতি দুর্বল হয়ে যায় এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ঋণের বিপরীতে ০.৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসান শ্রেণির ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

খেলাপি ঋণের সাম্প্রতিক উত্থান-পতনের পেছনে রয়েছে আগের বছরের ঋণ পুনর্মূল্যায়ন। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসার পর ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। পরে পুনর্মূল্যায়নে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ আড়াল করা হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, জুনে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আনলে প্রভিশন ঘাটতি কমানো সম্ভব নয়। এজন্য ঋণ অনুমোদনের আগে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং বিতরণ করা ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।