খামেনি, ইরান
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি   ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অভিযোগ করেছেন, দেশটিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষকে হত্যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে।

শনিবার এক বিবৃতিতে খামেনি বলেন, “ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্টরাই বিক্ষোভে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।” দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বিক্ষোভে ইরান জুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

সহিংসতায় বিদেশি শক্তির সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “ইরানবিরোধী সাম্প্রতিক এই বিদ্রোহ বা ফিতনাটি অতীতের চেয়ে ভিন্ন ছিল, কারণ এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছেন।”

ইরানি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—প্রধানত ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে—দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং মাঠ পর্যায়ে সহিংসতা পরিচালনার জন্য দায়ী করে আসছে। খামেনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরান সীমান্তের বাইরে কোনো যুদ্ধে জড়াবে না, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক কোনো অপরাধীকেই শাস্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া হবে না।

তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি রাসুল সেরদার আতা জানিয়েছেন, খামেনির এই মন্তব্য ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে এবারের বক্তব্যে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, “খামেনি অভিযোগ করেছেন যে অতীতের বিক্ষোভে আমেরিকার হস্তক্ষেপ কম ছিল, কিন্তু এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে ইরানের বিরুদ্ধে এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।”

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খামেনির বক্তব্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো মৃত্যুর সংখ্যা। প্রতিনিধি আতা বলেন, “এই প্রথম দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী কোনো ব্যক্তি বিক্ষোভে নিহত মানুষের সংখ্যার বিষয়ে ধারণা দিলেন। তিনি দাবি করছেন, সহিংস বিক্ষোভকারীরাই হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।”

এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে মৃত্যুর কোনো নিশ্চিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘এইচআরএএনএ’ (HRANA)-এর দাবি, বিক্ষোভে অন্তত ৩,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিলেন।

আল জাজিরার প্রতিনিধি উল্লেখ করেন, খামেনির দেওয়া হতাহতের এই তথ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির সাথে আংশিকভাবে মিলে যায়, যারা অনেক আগে থেকেই বলে আসছে যে সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এছাড়া ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বিক্ষোভের জেরে প্রায় ৩,০০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, যার মধ্যে ২৫০টিরও বেশি মসজিদ ও চিকিৎসাকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দেশটির কয়েকটি শহরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়।

আল জাজিরার প্রতিনিধি বলেন, “সরকার শুরুতে জনগণের দাবি এবং তাদের কষ্টের কথা স্বীকার করেছিল। কিন্তু এখন তারা দাবি করছে, শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলন পরবর্তীতে বিদেশি শক্তির নির্দেশে সহিংস বিক্ষোভকারীদের দ্বারা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত (হাইজ্যাক) হয়েছে।”

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, জড়িতরা বিদেশি শক্তির দ্বারা “সজ্জিত, অর্থায়িত এবং প্রশিক্ষিত” ছিল এবং খামেনি এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। এদিকে, টানা আট দিন ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকার পর ধাপে ধাপে সংযোগ ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে মোবাইল এসএমএস সেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে বলে শনিবার জানিয়েছে আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি।

সূত্র: আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই