গাজা, ফিলিস্তিন, হামাস
অনেক ক্ষেত্রেই মরদেহ তুলে ফেলা হয়েছে বা একাধিক মরদেহ মিশিয়ে ফেলা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার পরিবার তাদের প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়েছে   ছবি: সংগৃহীত

ফাতিমা আব্দুল্লাহর চোখের সামনে থেকে কিছুতেই সরছে না আল-বাতশ কবরস্থানের সেই ভয়াবহ দৃশ্য। গাজা সিটির এই কবরস্থানে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের এক পুলিশ কর্মকর্তার মরদেহ খুঁজতে গিয়ে চালিয়েছে ধ্বংসযজ্ঞ। ফাতিমার স্বামী, যিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তিনিও শায়িত ছিলেন সেখানে। কিন্তু আজ সেই কবরস্থান এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

তিন সন্তানের জননী ফাতিমা বলেন, "আমরা ভয়ে কুঁকড়ে ছিলাম। খবর পেলাম আল-বাতশ কবরস্থানে অভিযান চলছে। আমি শুধু ভাবছিলাম, আমার স্বামীর কবরের ওপর দিয়ে বুলডোজার যাচ্ছে না তো? আল্লাহকে ডাকছিলাম। কিন্তু ওরা মৃতদেরও রেহাই দিল না। কবর খুঁড়ে হাড়গোড়, মরদেহ সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার করে দেওয়া হলো।"

কবরস্থানেও আগ্রাসন
ইসরায়েলি বন্দি রান গিভিলির মরদেহ উদ্ধারের অভিযানে প্রায় ২৫০টি কবর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, কবরস্থানের পুরোনো ও নতুন অনেক সমাধিফলক ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফাতিমা আক্ষেপ করে বলেন, "ছুটির দিনে বা জন্মদিনে বাচ্চাদের নিয়ে ওদের বাবার কবরে যেতাম। বাচ্চারা মনে করত বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কিন্তু এখন সেই জায়গাটুকুও নেই।"

মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ ধ্বংসের পরিসংখ্যান
ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের তথ্যমতে, গাজার ৬০টি কবরস্থানের মধ্যে অন্তত ২১টি ইসরায়েলি হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেইত হানুন, আল-ফালুজা, শেখ রাদওয়ানসহ গাজার বিভিন্ন কবরস্থানে একই চিত্র দেখা গেছে। এমনকি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গাজা ওয়ার সিমেট্রিও রক্ষা পায়নি।

অনেক ক্ষেত্রেই মরদেহ তুলে ফেলা হয়েছে বা একাধিক মরদেহ মিশিয়ে ফেলা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার পরিবার তাদের প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়েছে। হামাস এই ঘটনাকে "অনৈতিক ও অবৈধ" উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

দ্বিতীয়বার হত্যার যন্ত্রণা
ম্যাডেলিন শুকায়লেহর বোন ও চার মাস বয়সী ভাগনিও সমাহিত ছিলেন আল-বাতশে। তিনি বলেন, "বোনের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তার কবর ধ্বংসের খবর পেলাম। খুঁজে খুঁজে কবরটা বের করেছিলাম, কিন্তু এখন সব শেষ। মনে হচ্ছে ওরা আমার বোনকে দ্বিতীয়বার হত্যা করল।" পরিবারটি এখন জানে না তাদের প্রিয়জনের মরদেহ আদৌ সেখানে আছে কি না।

বাবার কোনো কবর নেই
রোলা আবু সিদোর অভিজ্ঞতা আরও মর্মান্তিক। আল-শিফা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে সমাহিত তার বাবার কবরটি বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার অভাবে মারা যাওয়া বাবার মরদেহটি খুঁজতে গিয়ে রোলা দেখেন, সেখানে শুধুই মাটি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রোলা বলেন, "আমরা নিশ্চিত ছিলাম কোথায় তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খুঁড়ে কোনো মরদেহ পাওয়া গেল না। জানি না ওরা মরদেহগুলো কী করেছে। আজ আমার বাবার কোনো কবর নেই। বেঁচে থাকতে আমাদের প্রিয়জনদের কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আর এখন মৃত্যুর পর শেষ বিদায় জানানোর অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হলো।"

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো কবরস্থান ধ্বংস এবং মরদেহ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। গাজাবাসীর জন্য এটি এক নতুন ট্র্যাজেডি—যেখানে প্রিয়জনের কবরে গিয়ে শেষ বিদায় জানানোর জায়গাটুকুও আজ বিপন্ন।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই