দীর্ঘ ১৮ বছর শিক্ষকতা করার পর হঠাৎ ছাঁটাইয়ের খবর শুনে জ্ঞান হারান মরিয়ম শাবান (ছদ্মনাম)। ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) যে ৬০০ কর্মীকে বরখাস্ত করেছে, মরিয়ম তাদেরই একজন।
সম্প্রতি ইউএনআরডব্লিউএ কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আওতায় গাজায় স্থানীয় কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে, কাজের সময় হ্রাস করা হয়েছে এবং যারা গাজার বাইরে ‘বিশেষ ছুটিতে’ ছিলেন, তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সংস্থাটির কমিশনার-জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের বাজেটে ২২ কোটি মার্কিন ডলারের ঘাটতি মেটাতে তারা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
মরিয়মের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
৫২ বছর বয়সী মরিয়ম ২০০৭ সাল থেকে জাবালিয়ায় ইউএনআরডব্লিউএ-এর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। যুদ্ধের ভয়াবহতায় তিনি তার ২২ বছর বয়সী মেয়ে, ভাই ও ভাইয়ের পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। স্বামী গুরুতর আহত হওয়ায় চিকিৎসার জন্য বর্তমানে তিনি মিশরে অবস্থান করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরিয়ম আল জাজিরাকে বলেন, “চিকিৎসার জন্য দেশত্যাগ করা কি অপরাধ? সন্তান হারানোর শোক আর স্বামীর চিকিৎসা নিয়ে যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই চাকরি হারানোর খবর এল। এটা কোন ধরনের বিচার?”
ইউএনআরডব্লিউএ-কে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েল
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইউএনআরডব্লিউএ-এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছে, যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। ২০২৫ সালে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট (নেসেট) আইন পাস করে পূর্ব জেরুজালেমসহ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সংস্থাটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এমনকি চলতি মাসের শুরুতে বুলডোজার দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমে সংস্থাটির সদর দপ্তর আংশিক ধ্বংস করা হয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউএনআরডব্লিউএ-বিরোধী আইন বাতিল না করলে এবং জব্দকৃত সম্পদ ফেরত না দিলে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) তোলা হতে পারে।
বেতন কর্তন ও মানবিক বিপর্যয়
গাজায় অবস্থানরত কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ কমানোয় মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অনুদান কমে যাওয়ায় সংস্থাটি চরম অর্থ সংকটে পড়েছে। অথচ গাজার জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশই এই সংস্থার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ইউএনআরডব্লিউএ স্টাফ ইউনিয়নের প্রধান মোস্তফা আল-ঘৌল প্রশ্ন তুলেছেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গাজাকেই কেন বলির পাঁঠা বানানো হলো? গাজার মানুষ যখন মৃত্যু আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন তাদের সহায়তার পথ বন্ধ না করে করুণা দেখানো উচিত ছিল।”
জীবনরক্ষার শেষ অবলম্বনও বিপন্ন
গাজা সিটির বাসিন্দা ও তিন সন্তানের জননী জিহাদ আল-হারাজিন বলেন, “ইউএনআরডব্লিউএ ছিল আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এখন কিছুই নেই।” ইসরায়েলি বাধার কারণে গত কয়েক মাস ধরে সংস্থাটি খাদ্য সহায়তাও পৌঁছাতে পারছে না। লাজারিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল মানবিক সহায়তাকে ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ এবং ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়ার মতে, ইউএনআরডব্লিউএ কেবল একটি ত্রাণ সংস্থা নয়, এটি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও শরণার্থী পরিচয়ের প্রতীক। তিনি বলেন, “মানবিক কাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার অপরাধে আমাদের এই মূল্য দিতে হচ্ছে।”
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!