গাজা, ফিলিস্তিন, হামাস, ইসরায়েল
সীমান্ত খোলার প্রথম দিনে ইসরায়েল মাত্র পাঁচজন রোগীকে এই পথে গাজা ত্যাগের অনুমতি দিয়েছে, অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ   ছবি: সংগৃহীত

সংবাদ শিরোনামগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অবশেষে গাজা ও মিশরের মধ্যকার রাফাহ ক্রসিং খুলে দিয়েছে ইসরায়েল। এর ফলে চিকিৎসার জন্য মরিয়া আহত ফিলিস্তিনিরা এখন গাজা ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সোমবার সীমান্ত খোলার প্রথম দিনে ইসরায়েল মাত্র পাঁচজন রোগীকে এই পথে গাজা ত্যাগের অনুমতি দিয়েছে। ফলে শত শত, এমনকি হাজার হাজার মানুষকে এখনো অপেক্ষাতেই থাকতে হচ্ছে।

সেই ভাগ্যবান পাঁচজনের একজন ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবু মোস্তফা। সোমবার সে তার মা রান্ডার সঙ্গে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস হয়ে রাফাহতে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলের চালানো গত দুই বছরের ভয়াবহ গণহত্যা ও যুদ্ধে ৭০,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পাশাপাশি এই সীমান্তটিও বন্ধ রাখা হয়েছিল।

আল জাজিরাকে রান্ডা জানান, সোমবার সকালে একটি ফোনকলে তিনি জানতে পারেন যে বিদেশগামীদের প্রথম তালিকায় আহত মোহাম্মদের নাম রয়েছে। এরপর তাদের অবিলম্বে খান ইউনিসের রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণমুক্ত গাজার একমাত্র স্থলপথ রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত গাজা ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে সোমবারের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন এক বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জটিল প্রক্রিয়া এবং সীমিত সংখ্যক মানুষকে পারাপারের অনুমতি—সব মিলিয়ে গাজার বিশাল মানবিক চাহিদার তুলনায় এই উদ্যোগ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নগণ্য।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ইসরায়েলি নির্দেশ অনুযায়ী অনুমতিপ্রাপ্ত পাঁচ রোগীর প্রত্যেকের সঙ্গে দুজন করে সঙ্গী থাকার সুযোগ ছিল। ফলে সব মিলিয়ে মোট ১৫ জন সীমান্ত পাড়ি দিতে পেরেছেন। গাজার আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া আল জাজিরাকে জানান, শুধুমাত্র এই একটি দলই গাজা ত্যাগ করতে পেরেছে। অথচ মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয়কারী সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ জন রোগীর গাজা ছাড়ার কথা ছিল।

মিশরের সরকারি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, রাফাহ ক্রসিং দিয়ে ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে গাজায় ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তারা প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিন প্রান্তে পৌঁছেছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা বলেন, বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনে অপেক্ষমাণ প্রায় ২২,০০০ মানুষের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। তিনি আরও জানান, যুদ্ধের সময় গাজা ত্যাগ করা প্রায় ৮০,০০০ ফিলিস্তিনি এখন ফিরে আসতে চাইছেন।

চোখের আঘাত

রান্ডা জানান, দেড় বছর আগে খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় তাদের আশ্রয়স্থলের কাছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় মোহাম্মদ আহত হয়। তার চোখে সরাসরি আঘাত লাগে, যা তার অপটিক নার্ভ এবং দৃষ্টিশক্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

হাসপাতালের চত্বরে অন্য রোগী ও স্বজনদের সাথে অপেক্ষারত রান্ডা বলেন, “আহত হওয়ার পর থেকে আমার ছেলেটা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। দিনের পর দিন তার অবস্থার অবনতি হচ্ছে, অথচ গাজায় তার চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই নেই।” ছেলের চিকিৎসার জন্য যেতে পারার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলেও রান্ডার মনে রয়েছে গভীর বেদনা। কারণ, দ্বিতীয় সঙ্গী হিসেবে মাত্র একটি সন্তানকে নেওয়ার অনুমতি থাকায় তাকে বাকি চার সন্তানকে রেখেই যেতে হচ্ছে।

রান্ডা বলেন, “এখন আমার কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমার ছেলে যেন তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় এবং নিজের চোখে আবার পৃথিবীটা দেখতে পারে। এই মুহূর্তে এটাই আমার একমাত্র চিন্তা।” “আমি আশা করি ছেলে সুস্থ হলে দ্রুত গাজায় ফিরে আসব। অবরোধ উঠে যাবে এবং আমার ছেলের মতো সব রোগীই চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।”

ইসরায়েলি বিধিনিষেধ

রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের প্রাঙ্গণে ভ্রমণের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা অনেক রোগী রাফাহ সীমান্তে প্রথম দিনের বিধিনিষেধ নিয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন। অঙ্গহানি হয়েছে এমন কয়েকজনসহ বহু রোগী চিকিৎসার জন্য মিশরে যাওয়ার আশায় হাসপাতালে ভিড় করেছিলেন।

রোগী ও তাদের পরিবাররা অনেক আশা নিয়ে ভোরবেলায় উপস্থিত হলেও, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পাঁচজনের বেশি রোগীকে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। সীমান্ত আংশিক খোলার এই জটিল প্রক্রিয়ায় সবার মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রাফাহ ক্রসিং দিয়ে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াতের জন্য বহুস্তরের নিরাপত্তা প্রক্রিয়া শুরু হয় যাত্রীদের দৈনিক তালিকা তৈরির মাধ্যমে। এরপর ভ্রমণের আগে নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য সেই তালিকা ইসরায়েলি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়।

ইসরায়েলের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া কেউ এই ক্রসিং দিয়ে পার হতে বা প্রবেশ করতে পারে না। রাফাহ সীমান্তে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্ডার অ্যাসিস্ট্যান্স মিশনের কাজ শুধুমাত্র প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করা এবং পরিচয় যাচাই করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইউরোপীয় তত্ত্বাবধানে ক্রসিংয়ে প্রাথমিক পরিচয় যাচাইয়ের পর, গাজায় আগতদের ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকা চেকপয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত তল্লাশি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

গাজা রেড ক্রিসেন্টের মিডিয়া প্রধান রায়েদ আল-নিমস আল জাজিরাকে জানান, ক্রসিং দিয়ে চিকিৎসার জন্য আরও রোগী স্থানান্তরের বিষয়ে তারা এখনো আপডেটের অপেক্ষায় আছেন। তিনি আরও জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে সোমবার কেরেম আবু সালেম ক্রসিং দিয়ে একদল রোগীকে সফলভাবে ইসরায়েলে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তীব্র প্রয়োজন

সোমবার গাজা ত্যাগের অনুমতি পাওয়া পাঁচ রোগীর মধ্যে ইব্রাহিম আবু থুরায়াও একজন। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইব্রাহিম আহত হন। আঘাতের কারণে তার বাম হাত কেটে ফেলতে হয় এবং বাম চোখে এখনো স্প্লিন্টার (বোমার টুকরো) গেঁথে আছে।

রাফাহ যাওয়ার আগে খান ইউনিস থেকে তিনি বলেন, “দিন দিন আমার চোখের অবস্থা খারাপ হচ্ছে এবং আমি প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছি। বিশেষ করে স্প্লিন্টারটি চোখের পেছনে আটকে থাকায় কষ্ট বেশি হচ্ছে, আর গাজায় এর চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ডাক্তাররা বলেছেন, আমার বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন।”

সোমবার সকালে ডব্লিউএইচও (WHO) এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইব্রাহিমকে জানায় যে তার ভ্রমণের অনুমোদন মিলেছে। তার সঙ্গে যাচ্ছেন স্ত্রী সামার এবং তাদের ছেলে। তিনি বলেন, “চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে পারার আশায় আমি পুরো দুটি বছর ভীষণ কষ্ট করেছি। আমার মতো আরও হাজার হাজার আহত মানুষ আছে। আমি আশা করি এই সীমান্তটি স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া হবে।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই