গাজা, ফিলিস্তিন, হামাস, ইসরায়েল, রাফাহ
রাফাহ সীমান্ত পার হওয়ার অভিজ্ঞতাকে এক ‘বিভীষিকাময় যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফিলিস্তিনি নারীরা   ছবি: সংগৃহীত

মিশর থেকে গাজায় ফেরার পথে রাফাহ সীমান্ত পার হওয়ার অভিজ্ঞতাকে এক ‘বিভীষিকাময় যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফিলিস্তিনি নারীরা। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করে হাতকড়া পরানো হয়েছে, চোখ বেঁধে রাখা হয়েছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘হুমকির মুখে’ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সোমবার রাফাহ ক্রসিং দিয়ে যে ১২ জন ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুকে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের জন্য এই ঘরে ফেরার পথ ছিল ‘‘দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর—অপেক্ষা, ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা’’। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ইব্রাহিম আল খলিলি এসব তথ্য জানিয়েছেন।

আল খলিলি জানান, ফিরে আসা এই ছোট দলটিকে ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাফাহ সীমান্তে ফিলিস্তিনিরা ‘‘কখন এবং আদৌ’’ নিজ বাড়িতে ফিরতে পারবে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা এখন ইসরায়েলের হাতে। ফিরে আসা এক নারী আল জাজিরাকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘তারা আমাদের কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নিয়েছে। খাবার, পানীয়—সব। শুধু একটি ব্যাগ রাখার অনুমতি দিয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রথমে আমার মাকে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর আমাকে ডাকে এবং নিয়ে যায়।’’

‘‘তারা আমাকে হাতকড়া পরায় এবং চোখ বেঁধে ফেলে। প্রথম তাঁবুতে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা জানতে চায় আমি কেন গাজায় ঢুকতে চাই। আমি বলি, আমি আমার সন্তানদের দেখতে চাই এবং নিজের দেশে ফিরতে চাই। তারা আমাকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করে, সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করার এবং নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য করার চেষ্টা করে,’’ যোগ করেন তিনি। ওই নারী আরও বলেন, ‘‘সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা আমাকে দ্বিতীয় তাঁবুতে নিয়ে যায় এবং রাজনৈতিক প্রশ্ন করতে থাকে, যার সাথে [এই যাত্রার] কোনো সম্পর্ক ছিল না... তারা আমাকে বলে উত্তর না দিলে আটক করা হতে পারে। হুমকির মুখে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে আমরা বাসে উঠি। জাতিসংঘ আমাদের গ্রহণ করে, এরপর আমরা নাসের হাসপাতালে যাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমরা আমাদের প্রিয়জনদের সাথে পুনিলিত হতে পেরেছি।’’

দলটির আরেক সদস্য ৫৬ বছর বয়সী হুদা আবু আবেদ রয়টার্সকে বলেন, রাফাহ সীমান্ত পার হওয়া ছিল ‘‘আতঙ্ক, অপমান আর নির্যাতনের এক যাত্রা’’। রয়টার্স জানিয়েছে, তিনজন নারী সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করেছেন কীভাবে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

ফিলিস্তিনি ও মিশরীয় সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, সোমবার প্রায় ৫০ জন ফিলিস্তিনির গাজায় প্রবেশের কথা ছিল। কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মাত্র ১২ জন—তিন নারী ও নয় শিশুকে—সীমান্ত পার হওয়ার অনুমতি দেয়।

পরিস্থিতি আরও করুণ ছিল গাজা ছাড়তে চাওয়াদের জন্য। সোমবার চিকিৎসার প্রয়োজনে অপেক্ষমাণ ৫০ জনের মধ্যে মাত্র পাঁচজন রোগী এবং তাদের সাতজন স্বজন ইসরায়েলি তল্লাশি পার হয়ে মিশরে প্রবেশ করতে পেরেছেন। খান ইউনিস থেকে আল জাজিরার হিন্দ খৌদারি জানান, মঙ্গলবার রাফাহ দিয়ে আরও মাত্র ১৬ জন ফিলিস্তিনি রোগীকে মিশরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

খৌদারি বলেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রতিদিন উভয় দিক থেকে ৫০ জন করে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে সংখ্যাটা তার চেয়ে অনেক কম। তিনি বলেন, ‘‘রাফাহ দিয়ে যাতায়াতে কেন এত দেরি করা হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। পুরো প্রক্রিয়াটিতে অস্বাভাবিক সময় লাগছে।’’ খৌদারি আরও যোগ করেন, ‘‘জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজায় প্রায় ২০,০০০ মানুষ বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।’’

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই