অক্টোবরে ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনে গাজা উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদিকে বুধবার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে ফিলিস্তিনি রোগী ও আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৫২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১,৮০৩ জনে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের তদন্তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে। গাজার খান ইউনিস থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক আবু আজজুম জানান, তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজার ফিলিস্তিনিরা এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘‘গত কয়েক ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা মাথার ওপর ইসরায়েলি ড্রোন ওড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, যা আরও সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’’ চিকিৎসা সূত্রগুলো জানিয়েছে, বুধবার নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকটি শিশু রয়েছে।
আল জাজিরার মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা জানান, উত্তর গাজায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের দক্ষিণে কিজান আবু রাশওয়ান এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আল জাজিরা।
অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থতাকৃত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজাজুড়ে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ হামলার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের একজন রিজার্ভ অফিসার গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর তারা উত্তর গাজায় সাঁজোয়া যান ও বিমান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
বাহিনীটি জানিয়েছে, আহত অফিসারকে হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানা নির্দেশকারী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার কাছে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার সময়। আবু আজজুম জানান, পূর্ব গাজায় ইসরায়েল ‘ইয়েলো লাইন’ এর অবস্থান পরিবর্তন করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাফাহ দিয়ে রোগী স্থানান্তর স্থগিত
ইসরায়েলি হামলা বৃদ্ধির মধ্যেই ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (PRCS) জানিয়েছে, বুধবার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে ফিলিস্তিনি রোগীদের তৃতীয় দলটিকে সরিয়ে নেওয়ার সমন্বয় ইসরায়েল বাতিল করেছে। গাজার খান ইউনিস থেকে পিআরসিএস-এর মুখপাত্র রায়েদ আল-নিমস আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যবশত, কয়েক মিনিট আগে আমাদের জানানো হয়েছে যে আজকের স্থানান্তর প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে।’’ তিনি জানান, বুধবার সকালে ইসরায়েল তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
আল-নিমস আরও জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী অসুস্থ ও আহতদের রেড ক্রস সোসাইটি হাসপাতালে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আসার কথা ছিল। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের রাফাহ সীমান্তে এবং সেখান থেকে মিশরের হাসপাতালে বা অন্য কোথাও পাঠানোর কথা ছিল।
এর আগে সোমবার মাত্র পাঁচজন এবং মঙ্গলবার ১৬ জন ফিলিস্তিনিকে মিশরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, প্রতিদিন ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে। ইসরায়েল এখন দাবি করছে, গাজা থেকে রাফাহ সীমান্তে বাসিন্দাদের আগমনের সমন্বয়কারী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রয়োজনীয় সমন্বয় বিবরণ জমা দেয়নি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বেসামরিক বিষয়াবলি তদারককারী ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থা কোগ্যাট (COGAT) এক এক্স পোস্টে জানিয়েছে, ‘‘প্রক্রিয়াগত কারণে এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বিবরণ জমা দেয়নি ডব্লিউএইচও।’’
এ বিষয়ে ডব্লিউএইচও-এর পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গাজার একমাত্র বহির্বিশ্বের প্রবেশপথ রাফাহ ক্রসিং কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ইসরায়েল খুলতে রাজি হলেও যাতায়াতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
কেবল যুদ্ধের সময় গাজা ত্যাগ করা এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ ফিলিস্তিনিরাই ফিরে আসার অনুমতি পাচ্ছেন। যারা ফিরে আসছেন, তারা যাত্রাপথে চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরানো, জিজ্ঞাসাবাদ এবং যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, ১৮,০০০-এর বেশি রোগী রাফাহ দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। এর মধ্যে ৪৪০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আল জাজিরার তারেক আবু আজজুম বলেন, কেন কিছু ফিলিস্তিনিকে গাজা ত্যাগ করতে বা ফিরে আসতে দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে ইসরায়েল কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছে না।
জেরিকো অভিযানে ফিলিস্তিনি নিহত
গাজায় যখন হত্যাকাণ্ড চলছে, তখন অধিকৃত পশ্চিম তীরেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরে অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে সাঈদ নাঈল আল-শেখ (২৪) নামে এক ফিলিস্তিনি তরুণ নিহত হন।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!