মিশর, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, আনাদোলু এজেন্সি, সেনাবাহিনী,  শান্তিচুক্তি,
মিশরকে ঘিরে হঠাৎ করেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।   ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তির অংশীদার মিশরকে ঘিরে হঠাৎ করেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দেশটির সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে দাবি করে তিনি মিশরের সেনাবাহিনীর “অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয়” ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যকে ঘিরে ইসরায়েল-মিশর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরায়েলি দৈনিক ইসরায়েল হায়োম বৃহস্পতিবার নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করেছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু মিশরের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি উত্থাপন করেন এবং এটিকে ইসরায়েলের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সূত্রগুলোর মতে, নেতানিয়াহু বৈঠকে বলেন, মিশরের সেনাবাহিনী ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। নেতানিয়াহুর ভাষায়, শান্তিচুক্তি বজায় রাখার স্বার্থেই এই শক্তি সঞ্চয়ের সীমা নির্ধারণ জরুরি।

ইসরায়েল হায়োমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিশরের সঙ্গে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা ও আস্থার বিষয়টি আলোচনার সময়ই এসব মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। তবে সামরিক উদ্বেগের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা যে অব্যাহত রয়েছে, সেটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস খাতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এখনো বহাল আছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ডিসেম্বর ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে জ্বালানি সরবরাহ ও রপ্তানিতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। ১৭ ডিসেম্বর নিজেই এই চুক্তির অনুমোদনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং এটিকে “ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চুক্তি” বলে অভিহিত করেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, চুক্তিটির মোট মূল্য ১১২ বিলিয়ন শেকেল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় বিপুল অঙ্কের সমান এবং আন্তর্জাতিক হিসাবে প্রায় ৩৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান—একদিকে সামরিক উদ্বেগ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা—ইসরায়েল-মিশর সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সিনাই উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর ১৯৭৯ সালের ২৬ মার্চ ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো কোনো আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েল সিনাই উপদ্বীপ থেকে তাদের সামরিক ও বেসামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয় এবং অঞ্চলটিকে নিরস্ত্রীকৃত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই শান্তিচুক্তির কাঠামোর মধ্যেই মিশরের সামরিক তৎপরতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। যদিও এখন পর্যন্ত কায়রোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন করে উত্তাপ ছড়াতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।