রাশিয়া, পুতিন, ইউক্রেন, জেলনস্কি
যুক্তরাষ্ট্রের-মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা আগামী সপ্তাহে জেনেভায় নতুন দফা আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন   ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধ চতুর্থ বছরের দিকে গড়ালেও কোনো ভূখণ্ড ছাড়ের আপাত লক্ষণ ছাড়াই, যুক্তরাষ্ট্রের-মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা আগামী সপ্তাহে জেনেভায় নতুন দফা আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার জানিয়েছেন, আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত আগের দুই দফা বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনাটি আগামী ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। রিয়া নভোস্তি বার্তা সংস্থার বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।

নতুন দফার এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা দিমিত্রো লিটভিন। প্রায় ১,২৫০ কিলোমিটার (৭৫০ মাইল) দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। মস্কো ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, আর কিয়েভ রাশিয়ার তেল শোধনাগারের মতো যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার আক্রমণ চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের শিল্পাঞ্চল ডনবাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ রয়ে গেছে।

রাশিয়া ডনবাসের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের সেই এক-পঞ্চমাংশ থেকে ইউক্রেনকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, যা এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, ইউক্রেন একতরফা সেনা প্রত্যাহারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুদ্ধবিরতি হলে রাশিয়া যাতে পুনরায় আক্রমণ চালাতে না পারে, সেজন্য পশ্চিমা নিরাপত্তা গ্যারান্টি চাইছে।

জেলেনস্কি গত সপ্তাহে বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র জুন মাসের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের আল্টিমেটামগুলোতেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর পর থেকে বিভিন্ন হিসেবে দেখা গেছে, লাখ লাখ সেনা এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বে আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত আগের দুই দফা ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় মূলত সামরিক বিষয়গুলো, যেমন সম্ভাব্য বাফার জোন এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল।

আসন্ন আলোচনায় রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা ভ্লাদিমির মেদিনস্কি। তিনি একজন কট্টরপন্থী সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী, যিনি ২০২২ সালের মার্চে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ব্যর্থ আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আবারও থাকবেন জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ। তার সঙ্গে থাকবেন জেলেনস্কির চিফ অফ স্টাফ কিরিলো বুদানোভ এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা।

আলোচনার আগে, রাশিয়ার বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যবর্তী রাতে পূর্ব ইউক্রেনে এক হামলায় ৮ থেকে ১৯ বছর বয়সী তিন ভাই নিহত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওদেসায় বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে রুশ হামলায় একজন নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন।

দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার ভলগোগ্রাদ অঞ্চলের স্থানীয় গভর্নর শুক্রবার জানান, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরসহ তিনজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার জেলেনস্কি জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে আলোচনার আগে মিত্রদের সমর্থন নিশ্চিত করতে তার দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে।

মিউনিখে কথা বলার সময় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেন, তিনি রুশ নেতাদের সঙ্গে “কথা বলতে প্রস্তুত”, কিন্তু রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের সঙ্গে “সিরিয়াস” বা আন্তরিক শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, ফরাসি প্রচেষ্টার পর ইউরোপীয় নেতাদের পুতিনের সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরুর আহ্বানের অংশ হিসেবে মস্কোর সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে। তবে রুশদের “অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে তারা সত্যিই যুদ্ধবিরতি এবং পরে একটি শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছুক,” বলেন জার্মান নেতা।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, “রাশিয়া যুদ্ধ জিতছে না, যেমনটা অনেকে ভাবছেন।” সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তথাকথিত রাশিয়ান ভাল্লুক এখানে নেই। মূলত তাদের গতি এখনো বাগানের শামুকর মতো ধীর,” এবং যোগ করেন যে মস্কো “খুব ধীরগতিতে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।”

অন্যান্য খবর অনুযায়ী, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা মিউনিখে তার চীনা সমকক্ষ ওয়াং ই-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে তারা “শান্তি প্রচেষ্টা এবং যুদ্ধ অবসানে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা” নিয়ে আলোচনা করেন। বেইজিং বলে আসছে যে ইউক্রেন যুদ্ধে তারা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখছে। তবে কিয়েভ এবং পশ্চিমা মিত্ররা অভিযোগ করে আসছে যে চীন রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে, বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই