জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি দল মত দিয়েছেন যে, দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন যেসব নির্যাতন চালিয়েছেন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়তে পারে। মঙ্গলবার, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি) কর্তৃক নিযুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা এপস্টেইনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত সংক্রান্ত মার্কিন সরকারের প্রকাশ করা লাখ লাখ নথির প্রতিক্রিয়ায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
তারা ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই রেকর্ডগুলোতে অমানবিকীকরণ, বর্ণবাদ এবং দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন, "নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর এই নৃশংসতার মাত্রা, প্রকৃতি, পদ্ধতিগত চরিত্র এবং আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি এতটাই ভয়াবহ যে, এর অনেকগুলিই যুক্তিযুক্তভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি মানদণ্ডে পড়তে পারে।"
ইউএনএইচআরসি প্যানেল এপস্টেইন এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এপস্টেইনের সহযোগীদের তালিকায় বিশ্ব রাজনীতি, ব্যবসা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তারা আরও যোগ করেন যে, ফাইলগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য একটি "বৈশ্বিক অপরাধচক্রের" ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, "'এপস্টেইন ফাইলস'-এ থাকা সমস্ত অভিযোগ অত্যন্ত জঘন্য প্রকৃতির এবং এর জন্য স্বাধীন, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি এতদিন ধরে কীভাবে এই ধরনের অপরাধ চলতে পারল, তা নির্ধারণে অনুসন্ধানও জরুরি।" গত ৩০ জানুয়ারি মার্কিন সরকারের রেকর্ড থেকে এপস্টেইন সংক্রান্ত ৩৫ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশের পর এই সর্বশেষ নিন্দা জানানো হলো।
নভেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিদলীয় আইন ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অংশ হিসেবে এই ফাইলগুলো প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক ছিল। এই আইনে মার্কিন সরকারকে ৩০ দিনের মধ্যে এপস্টেইন সংক্রান্ত সমস্ত নথি অনুসন্ধানযোগ্য (searchable) ফরম্যাটে প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে শুধুমাত্র ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে তথ্য আড়াল করার সুযোগ ছিল।
কিন্তু ৩০ দিনের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও ফাইলগুলোর কেবল আংশিক প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি ৩০ জানুয়ারির প্রকাশনাকেও অসম্পূর্ণ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে, কারণ বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে সরকারের কাছে ৬০ লাখেরও বেশি ফাইল থাকতে পারে।
সদ্য প্রকাশিত নথিগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে এপস্টেইনের সম্পর্কের নতুন তথ্য উন্মোচন করেছে, কিন্তু খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিকেই জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এপস্টেইন তার যৌন অপরাধের জন্য খুব সামান্যই আইনি পরিণতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় তিনি একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছান, যেখানে তিনি পতিতাবৃত্তি ও যৌন পাচারের জন্য শিশুদের প্রলুব্ধ করার দোষ স্বীকার করেন, কিন্তু তাকে মাত্র ১৩ মাস জেল খাটতে হয়েছিল।
২০১৯ সালে ফেডারেল অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে কারাগারে থাকাকালে তিনি তার সেলে আত্মহত্যা করেন। যৌন পাচার চক্রে ভূমিকার জন্য এপস্টেইনের সাবেক বান্ধবী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে ২০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবারের বিবৃতিতে জাতিসংঘের প্যানেল বিশেষজ্ঞরা এপস্টেইন ফাইলে প্রচুর তথ্য মুছে ফেলার (redactions) কঠোর সমালোচনা করেছেন, যা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, "তথ্য পুরোপুরি প্রকাশে বা তদন্তের পরিধি বাড়াতে অনীহার কারণে অনেক ভুক্তভোগী পুনরায় মানসিক আঘাত (retraumatized) পাচ্ছেন এবং তারা একে 'প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাসলাইটিং' (এক ধরণের মানসিক প্রতারণা) বলে অভিহিত করছেন।"
তাদের এই সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের অভিযোগগুলোরই প্রতিধ্বনি। সেখানকার আইনপ্রণেতারা যুক্তি দিয়েছেন যে, এপস্টেইনের সাবেক বন্ধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কংগ্রেসের নির্ধারিত নির্দেশিকার বাইরে গিয়ে নথিপত্রের তথ্য মুছে ফেলে নভেম্বরের আইনটি অমান্য করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, সেখানে "ত্রুটিপূর্ণ সম্পাদনা" লক্ষ্য করা গেছে যা ভুক্তভোগীদের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে। তারা আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আরও অনেক কিছু করতে হবে। তারা বলেন, "'এপস্টেইন ফাইলস' ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যেকোনো পরামর্শ অগ্রহণযোগ্য। এটি ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারই নামান্তর।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!