লেবানন, ত্রিপোলি
লেবাননের ত্রিপোলিতে ভবন ধস   ছবি: সংগৃহীত

হোসাম হাজরুনি একটি কংক্রিটের সিঁড়ির নিচে আঙুল দিয়ে নিজের ভবনের উন্মুক্ত ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন দেখাচ্ছিলেন। ৬৫ বছর বয়সী হোসাম বলেন, "ভেতরে দেখুন। ভেতরের পিলারগুলো সব ভেঙে গেছে। পানিতে তলিয়ে আছে। ভেতরের সবকিছু ভেজা।" কয়েক মিটার দূরেই পড়ে আছে ভাঙা কংক্রিটের ব্লক আর দুমড়ানো-মোচড়ানো ধাতব স্তূপ। এটি সেই ভবনের ধ্বংসাবশেষ, যা গত ৮ ফেব্রুয়ারি ধসে পড়েছিল এবং অন্তত ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।

ত্রিপোলিতে ভবন ধস এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল এই শীতেই এটি চতুর্থ ভবন ধসের ঘটনা। পুরনো অবকাঠামো, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ২০১৯ সালের লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট, ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে অবকাঠামোর ভিত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া এবং তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত—সব মিলিয়ে আজ শত শত ভবন ধসের ঝুঁকির মুখে। হাজরুনির মতো স্থানীয়রা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন—পরবর্তী ধসের শিকার তাদের ভবনটিই হবে না তো?

আকাশের দিকে দুই হাত তুলে তিনি প্রশ্ন রাখেন, "তারা আমাদের বলছে সরে যেতে, এখানে না থাকতে। কিন্তু আমরা এই দুরবস্থার মধ্যে কীভাবে যাব? আমরা যাব কোথায়?" ১৯৫০-এর দশকে লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর ত্রিপোলি ছিল এই অঞ্চলের বাণিজ্য ও নৌচলাচলের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এর মর্যাদা কমে গিয়ে এখন এটি ভূমধ্যসাগর তীরের অন্যতম দরিদ্র শহরে পরিণত হয়েছে।

এটি চরম বৈষম্যেরও শহর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ সাফাদির মতো একাধিক বিলিয়নেয়ার এই শহরে বাস করেন। অথচ ২০২৪ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

বছরের পর বছর ধরে ত্রিপোলির মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা শহরের দক্ষিণ প্রান্তে সরে গেছেন, আর জরাজীর্ণ পুরনো শহরে ফেলে গেছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। অনেক গরিব মানুষ জানেন তাদের কংক্রিটের ভবনগুলো পুরনো এবং করুণ অবস্থায় আছে, কিন্তু তা মেরামতের সামর্থ্য তাদের নেই।

দক্ষিণ ত্রিপোলির একটি রেস্তোরাঁ থেকে আল জাজিরাকে প্রকৌশলী ফয়সাল আল-বাক্কার বলেন, "প্রথম সমস্যা হলো কাঠামোটা অনেক পুরনো।" আল-বাক্কার 'ত্রিপোলি ইমার্জেন্সি ফান্ড'-এর প্রতিষ্ঠাতা। ভবন ধসের সমস্যা মোকাবিলায় এবং শহরের মানুষকে সাহায্য করার জন্য এই ব্যক্তিগত উদ্যোগটি তহবিল সংগ্রহ করছে। আল-বাক্কার ব্যাখ্যা করেন, "কংক্রিটের আয়ুষ্কাল ৫০ থেকে ৮০ বছর।" মধ্য ত্রিপোলির অনেক ভবনেই সেই সময়সীমা শেষ হয়ে আসছে। সাদা কাগজে নীল কলম দিয়ে তিনি একটি ভবনের ভিত্তির নকশা আঁকলেন।

দেয়ালের ভিত্তির চারপাশে রেখা টেনে তিনি বলেন, "সময়ের সাথে সাথে কংক্রিটের পিএইচ (pH) মাত্রা আরও বেশি অম্লীয় বা অ্যাসিডিক হতে থাকে। এরপর এটি ইস্পাত বা রডকে ক্ষয় করে—ইস্পাত নিজেই ধ্বংস হয়ে যায়—আর তখন ভবন ধসে পড়ে।" কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনায় সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৩ সালে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল ও তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা ভূমিকম্প ত্রিপোলিতেও ব্যাপকভাবে অনুভূত হয়েছিল। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এতে পুরনো ভবনগুলোর অবকাঠামোগত ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অনেকগুলোতে আবার অনিয়মিত বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফ্লোর বা তলা যোগ করা হয়েছে, যা সেগুলোকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকটের আগে থেকেই এলাকাটি বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও অবকাঠামোগত অভাবের শিকার।

সর্বশেষ সমস্যা হলো পানির ক্ষতি। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর লেবাননে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি ভবন ধসের আগের দিনগুলোতেও কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছিল। আল-বাক্কার বলেন, "পানি কংক্রিটের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে এবং ইস্পাতের অবস্থাও খারাপ করে দিচ্ছে।" এ কারণেই আল-বাক্কার সরকারি ঘাটতি পূরণের জন্য শহরের "সেরা ও সবচেয়ে সফল" ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছেন।

তাদেরই একজন সারাহ আল-শরিফ, যিনি ত্রিপোলি ইমার্জেন্সি ফান্ডের মুখপাত্র ও তহবিল সংগ্রহ কমিটির সদস্য। তিনি যুব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করা অলাভজনক সংস্থা 'রুওয়াদ আল তানমেয়া'-র লেবানন পরিচালক এবং গত বছর ত্রিপোলি বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েছেন।

৮ ফেব্রুয়ারি ধসে পড়া ভবন থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরে বাব আল-তাব্বানেহে নিজের অফিসে বসে আল-শরিফ বলেন, "আপনারা এমন এলাকার কথা বলছেন যেখানে সব না হলেও অধিকাংশ ভবনই পুরনো ও জরাজীর্ণ, যার কিছু আসলে ধসের দ্বারপ্রান্তে।"তিনি বলেন, "সমস্যাটা যে এত বড়, তা রাষ্ট্রের দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা অবহেলারই প্রতিফলন, যারা এই শহরের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করেনি।"

আল-শরিফ বলেন, তিনি বর্তমান সরকারকে (যারা এক বছর আগে দায়িত্ব নিয়েছে) দায়ী করছেন না। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে "যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা কিছুই করেননি, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেননি।" তিনি আরও বলেন, "এর কিছু দায় বাড়ির মালিকের, কিছু ভাড়াটিয়ার এবং কিছু সেই ব্যবসায়ী বা নির্মাতাদের যারা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছেন। তাই সবাইকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব নিতে হবে।"

রাস্তায় দাঁড়িয়ে ৭০ বছর বয়সী উইসাম কাফরুনি ৮ ফেব্রুয়ারি ধসে পড়া ভবনের কয়েকটা দালান পরের একটি ভবনের ছাদের দিকে ইশারা করলেন। সিঁড়ির মতো আঁকাবাঁকা হয়ে ভবনের পাশ দিয়ে নেমে গেছে একটি ফাটল। তিনি জানান, তার ভাতিজা ওপরের তলায় ভাড়া থাকেন, কিন্তু বাড়ির মালিক দাবি করছেন মেরামতের দায়িত্ব ভাড়াটিয়ার।

এই এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামসহ অনেক কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা আরও বলছেন, বছরের পর বছর ধরে তাদের বলা হয়েছে যে স্থানীয় পৌরসভার অবকাঠামো মেরামতের পরিকল্পনা আছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্থানীয় সরকার বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার কথা জানত, কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব কমই করা হয়েছে। ডেপুটি মেয়র খালেদ কাব্বারা ২০২৫ সালে নির্বাচিত নতুন পৌর সরকারের অংশ।

ত্রিপোলির পৌরসভা সদর দপ্তর থেকে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "ফাটল ধরা ভবনের সমস্যাটি ত্রিপোলি শহরে অনেক পুরনো এবং দুর্ভাগ্যবশত আগের সময়গুলোতে এটি নিয়ে কাজ করা হয়নি।" তবে ২০২৫ সালে নির্বাচিত এই নতুন পৌর সরকার "আওয়াজ তুলেছে" বলে তিনি দাবি করেন।

কাব্বারা আরও বলেন, ১৯৪০-এর দশকে স্বাধীনতার পর থেকেই বৈরুত ঐতিহাসিকভাবে ত্রিপোলিকে উপেক্ষা করে আসছে। তবে বর্তমান সরকার সমাধানের জন্য স্থানীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি বলেন, "সত্যি বলতে, এই প্রথম আমরা মনে করছি কেউ আমাদের কথা শুনছে এবং কেউ আমাদের সঙ্গে কাজ করছে।"

একদল প্রকৌশলী বর্তমানে শহরজুড়ে ভবনগুলো পরিদর্শন করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো মেরামত করা সম্ভব কিনা নাকি খালি করে ভেঙে ফেলতে হবে, সে বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ১১৪টি ভবনের জন্য উচ্ছেদের সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তবে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো যাতে বিকল্প বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারে, সে জন্য তাদের এক বছরের আশ্রয় ভাতা দেওয়া হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দরজা খুলে দিয়েছে, আর তুরস্কও প্রায় ১০০টি প্রাক-নির্মিত (prefabricated) ঘর অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাসিন্দারা যাতে তাদের ভবনের সমস্যা জানাতে পারেন, সে জন্য একটি কল সেন্টারও খোলা হয়েছে। কাব্বারা জানান, হটলাইনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫০টি ভিন্ন ভিন্ন ভবনের বিষয়ে রিপোর্ট এসেছে।

কল সেন্টারে আগে রিপোর্ট করা ভবনগুলোর মধ্যে একটি ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি ধসে পড়া সেই ভবনটি। স্থানীয়রা ভবনটি থেকে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। কাব্বারা স্বীকার করেন যে রিপোর্টটি পাওয়া গিয়েছিল এবং বাসিন্দারা ভয় পাচ্ছিলেন। তবে তিনি বলেন, ধসে পড়ার আগে প্রকৌশলীরা এটি পরিদর্শন করেননি, কারণ রিপোর্টে এমন কিছু ছিল না যা দেখে জরুরি পরিদর্শনের প্রয়োজন মনে হয়েছিল।

বাব আল-তাব্বানেহে ফিরে এসে অসংখ্য স্থানীয় বাসিন্দা তাদের হতাশা ও ভয়ের কথা জানালেন। তারা বলেন, অনেক কর্মকর্তা ও সমিতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, কিন্তু সাহায্যের প্রতিশ্রুতি খুব কমই পূরণ হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী সামির রজব বলেন, "সিনিওরা সরকারের আমল থেকেই আমাদের বলা হচ্ছে অবকাঠামো মেরামতের পরিকল্পনা আছে। কিন্তু কিছুই হয় না।" উল্লেখ্য, ফুয়াদ সিনিওরা ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

ধ্বংসস্তূপের পাশেই ৫৪ বছর বয়সী মোস্তফা আল- আবেদ তার ছোট ওয়ার্কশপে একটি নষ্ট ওয়াশিং মেশিন মেরামত করছিলেন। তিনি বলেন, ইদানীং তার কাজের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। কারণ এই এলাকার অনেক মানুষ দারিদ্র্যের কারণে নষ্ট যন্ত্রপাতির বদলে হাতেই কাপড় ধুতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি কয়েক দিন আগে ধসে পড়া ভবনটির দিকে তাকালেন। "সমস্যাটা আর এখানে নেই। এই মানুষগুলো তো মরেই গেছে," তিনি বলেন। এরপর রাস্তার উল্টো পাশে রমজানের কেনাকাটায় ব্যস্ত একটি জনবহুল এলাকার দিকে আঙুল তুলে বলেন, "সমস্যা হলো ওই বাকি সব ভবন।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই