ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে ইসরায়েলে দুই দিনের সফর শুরু করতে যাচ্ছেন। এর আগে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটি সফর করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতাকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ছিল অন্যতম। কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচক এবং আরব বিশ্বের বাইরের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিল নয়াদিল্লি। ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তবে ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।
স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে (১০:৪৫ জিএমটি) তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোদির অবতরণের কথা রয়েছে। ২০১৭ সালের মতো এবারও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এরপরই দুই নেতার বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
বিকেল সাড়ে ৪টায় (১৪:৩০ জিএমটি) জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেবেন মোদি। রাতে তিনি তেল আবিবে ফিরে আসবেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি হলোকাস্টের শিকারদের স্মরণে নির্মিত ‘ইয়াদ ভাশেম’ জাদুঘর পরিদর্শন করবেন এবং ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের সাথে দেখা করবেন। এরপর মোদী ও নেতানিয়াহু পুনরায় বৈঠক করবেন এবং বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বিকেলে মোদি ইসরায়েল ত্যাগ করবেন।
উভয় পক্ষের কর্মকর্তাদের মতে, মোদি ও নেতানিয়াহুর এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি জোরদার করা। ইসরায়েলে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত জেপি সিং বলেন, "আমরা একে অপরের প্রতিযোগী নই, বরং পরিপূরক। ইসরায়েল উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে খুব ভালো। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হবে।"
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই বৈঠকে বিদ্যমান নিরাপত্তা চুক্তিগুলো হালনাগাদ করারও লক্ষ্য রয়েছে। সোমবার ইসরায়েলি দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার বলেছেন, "আমাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব দারুণ গতি পাচ্ছে। আমরা আশা করছি এই বছরই একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারব।" তিনি জানান, ইসরায়েল চায় ভারতীয় অবকাঠামো কোম্পানিগুলো তাদের দেশে এসে বিনিয়োগ ও নির্মাণকাজে অংশ নিক। রবিবার এক টুইট বার্তায় নেতানিয়াহু লেখেন, "আমরা উদ্ভাবন, নিরাপত্তা এবং অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার। একসঙ্গে আমরা স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জাতিসমূহের একটি অক্ষ তৈরি করছি।"
বছরের পর বছর ধরে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের আমূল উন্নতি হয়েছে। ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে জোরালোভাবে সমর্থন করত। ১৯৩৮ সালের ২৬ নভেম্বর মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, "ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের এবং ফ্রান্স যেমন ফরাসিদের, ফিলিস্তিনও ঠিক তেমনই আরবদের।"
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল সৃষ্টির বিরোধিতা এবং ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছিল ভারত। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই দৃশ্যপট বদলে যায়। বর্তমানে এশিয়ায় চীনের পর ভারতই ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৯২ সালে যেখানে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারে।
'মিডল ইস্ট আই'-এর সিনিয়র রিপোর্টার এবং লেখক আজাদ এসা আল জাজিরাকে বলেন, মোদীর আমলে সম্পর্কটি একটি 'বিশেষ সম্পর্কে' পরিণত হয়েছে, যার মূলে রয়েছে কৌশলগত সহযোগিতা এবং মতাদর্শগত মিল। তিনি বলেন, "এই সফরটি নেতানিয়াহুর জন্য মোদীকে ধন্যবাদ জানানোর একটি সুযোগ। তিনি ইসরায়েলিদের দেখাতে চাইবেন যে 'গ্লোবাল সাউথ'-এ তিনি একজন সম্মানিত ও জনপ্রিয় নেতা।"
মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করে, যা ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্রের ধারণার সাথে মিলে যায়। উভয় দেশই "ইসলামি সন্ত্রাসবাদ"-কে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে। সমালোচকদের মতে, এই তকমাটি মুসলিমবিরোধী নীতিকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হয়।
কেন এই সফর এত গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মোদীর এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুই দেশের উষ্ণ সম্পর্ক সত্ত্বেও, মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কার্যত (de facto) সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়ে ১০০টিরও বেশি দেশের সাথে যুক্ত হয়েছে। শুরুতে দ্বিধা থাকলেও, ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারত ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে।
এদিকে, নেতানিয়াহু সম্প্রতি একটি নতুন আঞ্চলিক জোট বা "হেক্সাগন" অ্যালায়েন্স গঠনের কথা বলেছেন, যাতে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং অন্যান্য আরব ও এশীয় দেশ থাকবে। যদিও ভারতসহ কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে সমর্থন দেয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদীর এই সফরকে অনেকে ইসরায়েলি নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবেই দেখবেন।
আজাদ এসা বলেন, "সফরের সময়টা লক্ষণীয়। নেতানিয়াহু যখন বিশ্বজুড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) তার নামে পরোয়ানা জারি করেছে, তখন বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতার এই সফর এবং নেতানিয়াহুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন—তার এবং ইসরায়েলের নীতির প্রতি একটি বড় সমর্থন হিসেবে গণ্য হবে।"
এছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। চাবাহার বন্দর থেকে ভারতের সরে আসা এবং ট্রাম্পের ইরানের ওপর হামলার হুমকির মধ্যে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বাড়লে ইসরায়েল সম্ভবত সেই যুদ্ধের সামনের সারিতেই থাকবে।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!