উপকূলীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থান ঘিরে আগে থেকেই এক ধরনের যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ইরান ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আরেক দফা পরোক্ষ আলোচনা শেষেও অবস্থার আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। তার সাথে যুক্ত হয়েছে—সর্বশেষ পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধের ডামাডোল। এর ফলে পুরো এশিয়া মহাদেশই যেন আকস্মিকভাবে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বনেতারা নিজ-নিজ জায়গা থেকে সোচ্চার হলেও পরিস্থিতি মোটেও ইতিবাচক নয় এই মুহুর্তে।
যুদ্ধের সূত্রপাত যেভাবে : বৃহস্পতিবার রাতে (২৬ ফেব্রুয়ারি) সীমান্তে তালেবান সরকারের বিনা উসকানিতে চালানো হামলার পর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ‘অপারেশন গাজাব-লিল-হক’ শুরু করে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানও প্রকাশ্য যুদ্ধের কথা জানায়। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশি গণমাধ্যম বিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে চলমান সংঘাতের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান। তিনি নিশ্চিত করেন যে, আফগানিস্তানে জঙ্গি অবস্থান লক্ষ্য করে পাকিস্তানি পাল্টা আঘাত অব্যাহত রয়েছে।
বিবৃতি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০-এর বেশি আহত হয়েছে। কাবুল, পাক্তিয়া ও কান্দাহারের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আরও হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবশ্য এসব তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উভয়পক্ষের বিভিন্ন রকম দাবির মাঝে বস্তুনিষ্ঠতাও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দুই দেশের সীমানা নির্ধারণকারী 'ডুরান্ড লাইন' বরাবর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে "বড় আকারের আক্রমণাত্মক অভিযান" চালানোর ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই শুক্রবার পাকিস্তান এই যুদ্ধের ঘোষণা দেয়।
সরকারের মুখপাত্র জানান, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে দুটি কোর হেডকোয়ার্টার, তিনটি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার, দুটি অস্ত্রাগার, একটি লজিস্টিক বেস, তিনটি ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার এবং দুটি সেক্টর হেডকোয়ার্টার। এছাড়া ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, আর্টিলারি গান এবং সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে বলে তিনি যোগ করেন।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় তাদের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। পাকিস্তানও জানিয়েছে যে তাদের বাহিনী পাল্টা আঘাত হেনেছে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কোরের মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নানগারহার ও পাকতিয়া প্রদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ‘ভারী সংঘর্ষ’ শুরু হয়।
তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এর আগে জানিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান কাবুল ও কান্দাহারের পাশাপাশি আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশে অন্তত একটি লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছে। তিনি এক্সে দাবি করেন যে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে এই খবরটি যাচাই করা হয়নি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন যে, পাকিস্তানের জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এক সরকারি বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো শত্রুতামূলক অভিপ্রায় মোকাবিলার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সশস্ত্র বাহিনী দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো হুমকি বরদাস্ত না করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।" তিনি আরও বলেন, "মাতৃভূমি রক্ষায় কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না এবং প্রতিটি আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।" তিনি যোগ করেন, "আমরা সর্বদা শান্তি চেয়েছি, কিন্তু দেশের ঐক্যে কোনো আঁচ লাগতে দেওয়া হবে না এবং সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর মোকাবিলা করবে।" জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আন্তঃসীমান্ত সংঘর্ষের খবর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই এরই মধ্যে শান্তি-সমঝোতার উপরে গুরুত্ব প্রদানের কথা জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা।
জাতিসংঘ :
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন এবং সহিংসতার বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিকের মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে গুতেরেস উভয় দেশকে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। সংঘাত চলাকালে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
ইরান :
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যিনি নিজের দেশকে সংঘাত থেকে দূরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় আলোচনায় যুক্ত আছেন, তিনিও বিবাদমান দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্ব তুলে ধরে এই সময়ে আত্মসংযম ও ইসলামি সংহতি বজায় রাখার পরামর্শ দেন।
শুক্রবার সকালে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে আরাঘচি জানান, ইরান এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন যে, কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতা বাড়াতে তাঁর দেশ যেকোনো ধরনের সহায়তা করতে রাজি আছে।
রাশিয়া :
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবদমান পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সীমান্ত হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উপায়ে মতপার্থক্য সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে বলে শুক্রবার আরআইএ নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে রাশিয়া মধ্যস্থতা করারও প্রস্তাব দিয়েছে।
পাকিস্তান :
দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা ও "সন্ত্রাসবাদ"-এর জন্য তালেবানকে দায়ী করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, ইসলামাবাদ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সরাসরি এবং বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে তিনি লিখেন, "পাকিস্তান ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে। আজ যখন আগ্রাসনের মাধ্যমে পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন আল্লাহর রহমতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন এটি প্রকাশ্য যুদ্ধ। এখন চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
আফগানিস্তান :
পাকিস্তানের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেছেন, দেশটি "যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ঐক্যের সাথে তাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং সাহসের সাথে আগ্রাসনের জবাব দেবে।" এক্সে তিনি লিখেন, "পাকিস্তান সহিংসতা ও বোমা হামলা—যা তাদের নিজেদেরই সৃষ্টি—থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। বরং তাদের উচিত নিজেদের নীতি পরিবর্তন করা এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক, শ্রদ্ধা ও সভ্য আচরণের পথ বেছে নেওয়া।"
ইরান পরিস্থিতি :
ইরান ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আরেক দফা পরোক্ষ আলোচনা শেষ হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী এই আলোচনাকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে দাবি করলেও, কোনো পক্ষই যুদ্ধ এড়াতে তাদের অবস্থান থেকে কতটা ছাড় দিতে রাজি, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার জেনেভায় আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় আরও কারিগরি আলোচনা হবে এবং এবারের অগ্রগতি ‘ভালো’ হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, “এটি ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর আলোচনা।” আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি জানান, ভিয়েনা বৈঠকের আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা নিজ নিজ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করবেন।
আলোচনার বিস্তারিত খুব একটা জানা যায়নি। তবে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির মতে, আরাকচি মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ করেছেন। আরাকচি নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধিদল বুধবার রাতে আল বুসাইদির কাছে তেহরানের লিখিত প্রস্তাব হস্তান্তর করে। আল বুসাইদি জেনেভা ও মাস্কাটে আগের দফার আলোচনাতেও মধ্যস্থতা করেছিলেন। হস্পতিবার ওমানি কূটনীতিক মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। আল বুসাইদি সারাদিন দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। মার্কিন প্রতিনিধিদল ইউক্রেন নিয়েও আলাদা আলোচনা করেছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসিও এই আলোচনায় অংশ নেন। কোনো চুক্তি হলে ইরানে পরমাণু মনিটরিং ও যাচাইকরণের দায়িত্ব আইএইএ-কেই পালন করতে হবে। জাতিসংঘের এই ওয়াচডগ বা নজরদারি সংস্থা ৬ মার্চ থেকে কয়েক দিনের বোর্ড মিটিং শুরু করবে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য যে ১০-১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, এই মিটিং তার কাছাকাছি সময়েই হচ্ছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ধারণা, জেনেভা আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বোর্ড মিটিংয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। গত জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান গ্রসির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগ এনেছিল এবং আইএইএ-র সমালোচনা করেছিল। হামলার একদিন আগেই সংস্থাটি একটি রেজোলিউশন পাস করে বলেছিল যে তেহরান পারমাণবিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি মানছে না।
সবমিলিয়ে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানে যে যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিরাজ করছে তা বিশ্বের সামগ্রিক শান্তি রক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে নানাভাবে। চলমান এই সাংঘর্ষিক ও উত্তেজনা থেকে ক্রমশ উত্তরণের পথ খোঁজাই সবার জন্য প্রত্যাশিত।
সূত্র : বিবিসি ও আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!