একুশে বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা
একুশে বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা   ছবি: সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম বড় আয়োজন অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ বর্ণাঢ্য আয়োজন ও বিপুল পাঠকসমাগমের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে এক মাসব্যাপী চলা এই মেলা বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।

রোববার (১৫ মার্চ) মেলার শেষ দিনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি’র উপস্থিতিতে সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি।

বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সদস্য-সচিব ড. মো. সেলিম রেজা মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের বইমেলাকে নতুন প্রত্যাশায় উজ্জীবিত করবে এমন আশাবাদও তিনি ব্যক্ত করেন।

মো. মফিদুর রহমান বলেন, এবারের বইমেলা আগের মেলাগুলোর তুলনায় অধিক পরিচ্ছন্ন ছিল। মেলায় প্রকৃত পাঠকদের উপস্থিতিও ছিল বেশি। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য মানসম্মত বই এবং আরও আনন্দদায়ক আয়োজন বৃদ্ধির বিষয়ে ভাবতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী এমপি বলেন, আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই, যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞান প্রসারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠকের অন্তর্গত চেতনাকে জাগ্রত করে, ন্যায়–অন্যায়ের বোধ সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্র গঠন ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে—সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার পাঠাভ্যাসের ওপর। তাই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দিতে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে।

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

এদিকে এবারের মেলার শুরুতে রমজানসহ বিভিন্ন কারণে দর্শনার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলা জমে ওঠে। বিশেষ করে শেষ সপ্তাহে পাঠকসমাগম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মেলার বিভিন্ন স্টলে বইপ্রেমীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। নতুন বই দেখা, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়া এবং বই কেনার আনন্দে মেতে উঠেছিলেন পাঠকরা।

এবারের বইমেলায় দেশীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রকাশকের শত শত স্টল অংশ নেয়। মেলা চলাকালে প্রতিদিনই নতুন নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার বই পাঠকদের হাতে পৌঁছেছে। কথাসাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, ইতিহাস, অনুবাদ ও শিশুতোষ বই সব মিলিয়ে মেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০৭টি।

এছাড়া শিশুদের জন্য এবার মুক্তমঞ্চের সামনে বড় পরিসরে শিশুচত্বর রাখা হয়। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশু প্রহর পালন করা হয়। এ সময় শিশুদের জন্য আবৃত্তি, সংগীত ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। শিশুচত্বরে পাপেট শো ও বায়োস্কোপও ছিল শিশুদের বিশেষ আকর্ষণ।

মেলার সাংস্কৃতিক পরিবেশও ছিল প্রাণবন্ত। প্রতিদিন বিকেলে মূলমঞ্চে আলোচনা সভা, বই প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। লেখক, গবেষক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে এসব আয়োজনে সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে।

তবে এবারের মেলায় কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। কয়েকদিনের বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে মেলার কিছু এলাকায় পানি জমে যায় এবং কয়েকটি স্টলে সামান্য ক্ষয়ক্ষতিও হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।

সব মিলিয়ে প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুরুতে ধীরগতির হলেও শেষদিকে বিক্রি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাঠকদের আগ্রহ, নতুন বইয়ের বৈচিত্র্য এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবারের মেলাকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়েছে।