গ্যাস সংকট, গ্রাহক ভোগান্তি
বাসায় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ অনেক কমে গেছে।   ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার অনেক বাসায় শীতের শুরুতেই সরকারি পাইপলাইনের গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। মাসের পর মাস বিল পরিশোধ করলেও গ্রাহকরা ন্যূনতম গ্যাসও পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি ও দামের ঊর্ধ্বগতি গ্রাহকদের আরও ভোগান্তিতে ফেলেছে। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে মাটির চুলা বা ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করছে।

বর্তমানে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত দুই চুলার পাইপলাইন গ্যাসের মাসিক বিল নেয়া হচ্ছে ১ হাজার ৮০ টাকা করে। সরকারি হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাস্তবে এটি কিনতে হচ্ছে অন্তত ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকাতে। একদিকে পাইপলাইন গ্যাসের ঘাটতি, অন্যদিকে এলপিজির বাড়তি দাম গ্রাহকদের দিশেহারা করে তুলেছে।

মগবাজারের গৃহিণী শামুসুন্নাহার মাহমুদা বলেন, ‘আমাদের বাসায় পাইপলাইন গ্যাস থাকলেও শীতের শুরু থেকে চুলায় গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে গেছে। সারাদিন অনেক সময়ই গ্যাস থাকে না। রাত ১২টার পর সামান্য গ্যাস এলে তাতেও রান্না সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে এলপিজি কিনতে হয়েছে। এতে সরকারি বিল এবং অতিরিক্ত খরচ—দুটোই বহন করতে হচ্ছে।’

মোহাম্মদপুরের চল্লিশ ফিটের বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আজমল হোসেন জানান, ‘পাইপলাইনের গ্যাস সারাবছরই পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না, শীতে তো একেবারেই থাকে না। মাঝরাতে কিছুটা গ্যাস এলে তখনই রান্না করতে হয়। বাধ্য হয়ে মাটির চুলাতেই রান্না করতে হচ্ছে।’

গাবতলী এলাকার বাসিন্দা মানিক মোল্লা বলেন, ‘সরকারি লাইনে শীতকালে একেবারেই গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে এলপিজি কিনলেও বাজারে মিলছে না, এবং যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তা কিনতে পারছি না। বিকল্প হিসেবে মাটির চুলায় রান্না করছি।’

ঢাকার অধিকাংশ বহুতল ভবনে মাটির চুলা ব্যবহার সম্ভব নয়। তাই অনেকেই ইলেকট্রিক বা ইন্ডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকছেন। দাম এখন ৪ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস সংকট বেড়ে যাওয়ায় ইন্ডাকশন চুলার বিক্রি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এলপিজির তীব্র সংকট

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশে এলপিজি সরবরাহ কমে গেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সরকারি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১,৩০৬ টাকা, তবে বাস্তবে তা বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ টাকায়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ নিষেধাজ্ঞা এবং এলসি খোলার জটিলতা মূল সংকটের কারণ। বড় এলপিজি কোম্পানিগুলো আমদানি কমিয়ে দেওয়াও ঘাটতি বাড়িয়েছে।

এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন ও ইউরোপে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশেও এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছে। এখনই সরবরাহ পুরোপুরি বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে সরকার ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। শিগগিরই বাজারে এলপিজি পাওয়া সহজ হবে।’

এ দিকে জানা যায়, দেশের বাজারে ৫ কোটি ৫০ লাখের মতো সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারই রিফিল হচ্ছে।

সরকারি পাইপলাইনের অবস্থা

রাজধানী ও আশপাশে তিতাস গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। 

পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তুরাগ নদীর নিচের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত এবং গণভবনের সামনে ভালভ ফেটে যাওয়ায় চাপ কমেছে। শীতকালে পাইপলাইনে জমে যাওয়ার কারণে এবং অবৈধ সংযোগ বেড়ে যাওয়ায় বৈধ গ্রাহকরা পুরো গ্যাস পাচ্ছেন না। নতুন কূপ খনন ও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, ‘সরকারি পাইপলাইনে গ্যাস না থাকাকে একটি সিগন্যাল হিসেবে নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে আবাসিক খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখনই প্রতিটি ঘরে এলপিজি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সংকট আরও তীব্র হতে পারে।’

সংকটের সমাধান কবে?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত সরকার যথেষ্ট বিনিয়োগ না করে আমদানির ওপর নির্ভর করেছে। শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হচ্ছে। সরকার ও পেট্রোবাংলার উদ্যোগ, নতুন কূপ খনন ও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার চেষ্টা চলছে।

এমকে/আরটিএনএন