পাসপোর্ট
বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা এখন থেকে ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারবেন।   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন বিশ্বের ৯৫তম অবস্থানে। যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পঞ্চম দুর্বল। মাত্র ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

২০১০ সালের তুলনায় এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণের সুযোগ অনেকটাই সীমিত। দেখা যায়, বাংলাদেশের পাসপোর্ট গত কয়েক বছর ধরে ক্রমেই দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল ভিসার সংখ্যা কমার বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণ।

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা ওভারস্টে বা অনুমতি ছাড়া অবস্থানের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস কমেছে। এই কারণে অনেক দেশ ভিসা নীতি আরও কঠোর করেছে।

তাদের মতে, শক্তিশালী কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক থাকলে সহজ ভিসা চুক্তি সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশে এমন সম্পর্ক সীমিত। ফলে পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের মান এবং নাগরিকদের আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতি মেনে আচরণও পাসপোর্টের শক্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নাগরিক ভিসা পাওয়ার পরেও বিদেশে দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন। উন্নত দেশগুলো এই ঝুঁকি বিবেচনা করে কঠোর ভিসা নীতি প্রণয়ন করছে।

বিশ্লেষকরা এটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন উৎস দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ, নাগরিকরা বৈধ ভ্রমণের বাইরে বিদেশে থাকতে পারে এমন আশঙ্কা দেশের পাসপোর্টের মান কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের উচ্চ যুব বেকারত্ব এবং সীমিত কর্মসংস্থান সুযোগও পাসপোর্ট দুর্বলতার একটি কারণ। বিদেশি দেশগুলো মনে করে, ভ্রমণের কাজে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে ভিসার সুযোগকে ব্যবহার করতে পারেন। এই ভয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে এবং পাসপোর্টের অবস্থান আরও নিচে নেমে গেছে।

ভিসা মুক্ত চুক্তি বা সহজীকরণ চুক্তির অভাবও বাংলাদেশের পাসপোর্টকে পিছিয়ে রেখেছে। উন্নত দেশগুলো সাধারণত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, নিরাপত্তা ও তথ্য বিনিময়ের ওপর ভিত্তি করে ভিসা সহজ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের চুক্তির সংখ্যা সীমিত।

বিশ্বের সপ্তম দুর্বল পাসপোর্ট বাংলাদেশের

পাসপোর্টের র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের সপ্তম দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের ২০২৬ সালের জানুয়ারির হালনাগাদ তথ্যে এমন অবস্থান দেখা গেছে। এ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পঞ্চম দুর্বল হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট।

পাসপোর্ট র‌্যাংকিংয়ে এবারও এককভাবে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৯২টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন।

র‌্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৮টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাঁচটি দেশ– ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৬টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ড ও নরওয়ে। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৫টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৪টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন।

পাসপোর্ট ইনডেক্সের একেবারে তলানিতে রয়েছে পাকিস্তান (৯৮তম), ইয়েমেন (৯৮তম), ইরাক (৯৯তম), সিরিয়া (১০০তম) ও আফগানিস্তান (১০১তম)। এসব দেশের নাগরিকরা যথাক্রমে ৩১, ২৯, ২৬ ও ২৪টি গন্তব্যে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।

হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সে ১৯৯টি পাসপোর্ট ও ২২৭টি গন্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। 

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনা

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখনও অনেক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

দ্য হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স এর তথ্যানুসারে, মালদ্বীপের পাসপোর্ট দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী; মালদ্বীপের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই ৯২টি দেশে প্রবেশ করতে পারেন। ভারতের, ভুটানের এবং শ্রীলঙ্কার পাসপোর্ট তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক। পাকিস্তান ও নেপালের পাসপোর্ট বাংলাদেশের থেকে কিছুটা নিচে অবস্থান করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; প্রতিবেশী দেশের কৌশল, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভিসা চুক্তির সক্ষমতাই মূলভাবে পাসপোর্টের শক্তিকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের পাসপোর্টের মূল চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের পাসপোর্টের দুর্বল অবস্থান কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক আচরণ ও কুকর্ম: বিদেশে ভিসা ওভারস্টে বা অনুমতি ছাড়া অবস্থানের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক বিশ্বাস কমেছে। অনেক দেশ সতর্ক হয়ে কঠোর ভিসা নীতি প্রণয়ন করছে। তাই এ ধরনের কাজ থেকে দেশের মানুষকে বিরত থাকতে হবে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা: দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় উন্নত দেশগুলো সহজ ভিসা প্রদানে দ্বিধা বোধ করছে।

কূটনৈতিক ও ভিসা চুক্তির সীমিত পরিধি: বাংলাদেশে সীমিত সংখ্যক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি থাকায় নাগরিকদের আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার সীমিত।

অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও অভিবাসন ঝুঁকি: অন্যান্য দেশের ধারণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিকরা বৈধ ভ্রমণের বাইরে থাকতে পারে, যা পাসপোর্টের শক্তি কমিয়ে দেয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমস্যাগুলো সমাধান না করা পর্যন্ত বাংলাদেশের পাসপোর্টের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি পাবে না।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পাসপোর্টের দুর্বল অবস্থান কেবল একটি তালিকার বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক বিশ্বাস, কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নাগরিকদের বৈশ্বিক আচরণের মিলিত ফল। এই সব সমস্যার সমাধান না হলে পাসপোর্টের শক্তি দ্রুত উন্নত হবে না।

এমকে/আরটিএনএন