নির্বাচন, আগ্নেয়াস্ত্র
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের আরও সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।   ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চাপ তত বাড়ে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে উদ্বেগ ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা শুধু রাজনৈতিক উত্তাপ নয়; বরং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবাহ, থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র, সংগঠিত চোরাচালান চক্র এবং নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে একটি জটিল নিরাপত্তা সংকেত।

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের হাতে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা নতুন অস্ত্র—এই দুই উৎস মিলেই নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে।

নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত হওয়া স্থাপনায়ও অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টাও হতে পারে—এমন আভাসও পেয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে। আবার মাঠপর্যায় থেকেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এমন আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।

অস্ত্রই অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু

শরীফ ওসমান হাদি হত্যা, মুসাব্বির হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এক ডজন হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। কারণ ভিন্ন—কোথাও রাজনৈতিক বিরোধ, কোথাও আধিপত্য বিস্তার, কোথাও দখল-বাণিজ্য—কিন্তু অস্ত্র এক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার করা অস্ত্রের বড় অংশই বিদেশি পিস্তল ও রিভলভার, যা দেশের অভ্যন্তরে তৈরি নয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবেশ করা অস্ত্রের প্রধান পথ সীমান্ত। যদিও সুনির্দিষ্ট রুটের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই, তবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও সুন্দরবন সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের তথ্য মিলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে মিয়ানমার সীমান্ত।

মিয়ানমার সীমান্ত: নীরব করিডোর

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত মূলত নাফ নদী, পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত। বহু অংশ অরক্ষিত ও দুর্গম। টেকনাফ থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত নজরদারি থাকলেও অস্ত্র ঢোকা থামছে না। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঈদগড়, বাইশফাঁড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফুলছড়ি, সোনাইছড়ি, বালুছড়ি সীমান্ত দিয়ে জি-৩, জি-৪ ও চীনা অস্ত্র ঢুকছে। এসব অস্ত্র প্রথমে রোহিঙ্গা নেটওয়ার্কের হাতে আসে, পরে পাচার হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের গহীন অরণ্যে চোরাচালান চক্রের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের তৈরি অস্ত্র দেশে ঢুকছে। সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ায় চক্রগুলো আরও গোপনে কাজ করছে। তারা অস্ত্র কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পাঠাচ্ছে।

চক্রের সদস্যদের ভাষায়, “মামলা কাঁধে নিয়েই পাহাড়ে থাকছি। বিজিবি-পুলিশের ভয় নিয়ে কাজ করছি। সুযোগ পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই।” এই বক্তব্য চোরাচালানের সামাজিক বাস্তবতাকেও উন্মোচন করে—অপরাধের পেছনে শুধু লোভ নয়, আছে দীর্ঘদিনের একটি সমান্তরাল অর্থনীতি।

১৪টি রুট, ডজনখানেক গ্রুপ

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের অন্তত ১৪টি রুট দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে। এসব রুটের বেশির ভাগই অরক্ষিত। অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত প্রায় ডজনখানেক গ্রুপ সক্রিয়, যাদের বড় অংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর।

বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে এসব অস্ত্র গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ছে—বিশেষ করে ‘নির্বাচনের মাঠে’। স্থানীয় বাসিন্দারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

বিজিবির সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম স্বীকার করেন, মিয়ানমার সীমান্ত একটি জটিল এলাকা। সেখানে কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় বাহিনী নেই, বরং নন-স্টেট অ্যাক্টর সক্রিয়। যোগাযোগ ও সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতাই চোরাচালান রোধে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজিবির তথ্যমতে, গত বছরের প্রথম নয় মাসে সীমান্ত থেকে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে এক হাজার ২০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানেও অস্ত্র উদ্ধার চলছে।

লুট হওয়া অস্ত্র: এখনো বড় ঝুঁকি

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার উদ্ধার হলেও এক হাজারের বেশি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা বহুগুণে বেড়েছে।

গত বছরের শেষ দিকে বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে উদ্ধার হওয়া ৮টি বিদেশি পিস্তল, বিস্ফোরক দ্রব্য কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আটক অস্ত্র—সবকিছুই ইঙ্গিত দেয়, অস্ত্রের স্রোত থামেনি।

‘লাইনম্যান’: সীমান্ত অপরাধের মূল কুশীলব

সীমান্ত অপরাধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো তথাকথিত ‘লাইনম্যান’। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় এমন ৭৮৭ জন লাইনম্যানের নাম রয়েছে। বান্দরবানে ১১৬, কক্সবাজারে ৯৯, সাতক্ষীরায় ৫২, সিলেটে ৫৮—এই পরিসংখ্যানই বোঝায় সমস্যা কতটা গভীর।

লাইনম্যানরা সীমান্ত পারাপারের রুট নির্ধারণ, নৌকা বা যানবাহনের ব্যবস্থা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলের সময়সূচি সম্পর্কেও ধারণা রাখে। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষায়, “তাঁদের ছাড়া বড় চোরাচালান প্রায় অসম্ভব।”

এ দিকে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ—এসব ঘটনা দেখায় সীমান্ত শুধু প্রবেশপথ নয়, পালানোর পথও। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী অবৈধভাবে দেশ ছেড়েছেন, যাদের বৈধ ইমিগ্রেশন রেকর্ড নেই।

সিআইডি জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ৭.৬৫ ক্যালিবার অস্ত্র ও গুলি দেশে অপ্রচলিত। অর্থাৎ নতুন করে অস্ত্র ঢুকছে—এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

নির্বাচনের সময় টাকার প্রবাহ বাড়ে। সেই সুযোগে জাল টাকা ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়ে। নতুন নকশার নোট সাধারণ মানুষের জন্য শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় সীমান্তকে ঘাঁটি বানিয়ে জাল নোট ছড়ানোর শঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ কারণে বিজিবি সীমান্তে নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

নজরদারি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই

বিশ্লেষকেরা একমত—সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে শুধু ভোটকেন্দ্র নয়, সীমান্তও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ করে যদি ওপারে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

পাহাড়, নদী ও দীর্ঘ সীমান্তে নজরদারি কঠিন—এটা সত্য। কিন্তু নির্বাচনের আগে সীমান্ত যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি যে ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

নির্বাচন শুধু একটি ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও নিরাপত্তার বড় পরীক্ষা। সীমান্তের ছায়াপথে যে অস্ত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সেই পরীক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে—এ আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।