জাতীয়, গ্যাস, সিলিন্ডার গ্যাস, মূল্য বৃদ্ধি, সরকারি দাম, গ্যাসের দাম,
সরকারি দামে মিলছে না সিলিন্ডার গ্যাস।   ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে লাইনের গ্যাসের সংকটের সুযোগে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। ফলে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। ভ্যাট কমিয়ে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল মিলছে না বাজারে।

রাজধানীর গ্রিনরোড এলাকার বাসিন্দা মাহফুজ আলম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। লাইনের গ্যাস নিয়মিত না থাকায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার রাখতে হয়। তবে সেটিও এখন বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।

মাহফুজ বলেন, ‘প্রতি মাসে লাইনের গ্যাস বিল দিতে হয় অথচ সময় গ্যাস থাকে না। ছোট বাচ্চা আছে হঠাৎ রান্নার প্রয়োজন পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনে রাখতে হয়। কিন্তু সরকারি দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। চলতি মাসেও ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের এক-দুইশ টাকাও হিসাব করে খরচ করতে হয়,’ বলেন তিনি।

মাহফুজ আলমের মতো রাজধানীর অনেকেরই একই অভিযোগ। বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে বাজারে সেই দামে কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। টঙ্গীর এক বিক্রেতা বলেন, ‘আমরাও বেশি দামে কিনি। কম দামে বিক্রি করব কীভাবে?’ ধানমন্ডির আরেক বিক্রেতা জানান, ‘অনেক সময় বাসায় পৌঁছে দিতে হয়, এতে বাড়তি খরচ হয়।’

অন্যদিকে লালবাগের বাসিন্দা শিমু আক্তার বলেন, ‘সরকার দাম কমিয়েছে শুনি, কিন্তু বাজারে গেলে কম দামে পাই না।’

ভ্যাট কমালেও বাজারে প্রভাব নেই:

বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার এলপিজির ওপর ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাস করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করে আমদানি পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। এই সিদ্ধান্ত ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

এনবিআরের মতে, নতুন কাঠামোর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে একাধিকবার ভ্যাট আরোপের পরিবর্তে একবার কর নেওয়া হবে, এতে ভোক্তার ওপর সামগ্রিক ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমার কথা। তবে বাস্তবে বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

দুই মাসে দামের ওঠানামা:

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ২ ফেব্রুয়ারি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। পরে ভ্যাট পুনর্বিন্যাসের পর ২৪ ফেব্রুয়ারি দাম কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু খুচরা বাজারে তা কার্যকর হয়নি।

যা বলছে বিইআরসি:

বিইআরসি সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সবাই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে এবং পরিস্থিতি শিগগির স্বাভাবিক হবে বলে আশা করি।’

সমালোচনা ক্যাবের:

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলমের অভিযোগ, বিইআরসি যথাযথ গণশুনানি ছাড়া ঘরে বসে দাম নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীরা সেই দাম মানছেন না, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, “দিনশেষে ভোক্তার পকেটই কাটা হচ্ছে।”

সব মিলিয়ে সরকারি দাম নির্ধারণ, ভ্যাট কমানো ও প্রশাসনিক উদ্যোগ সত্ত্বেও বাজারে এলপিজির দামে স্বস্তি না ফেরায় চাপে রয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।

আরবিএ/আরটিএনএন