আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম   ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সম্রাট রোবায়েত। অভিযোগ দায়েরের পর হঠাৎ করে অনাপত্তিপত্র জমা দেয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জমা দেন সম্রাট রোবায়েত। ওই অভিযোগে তিনি দাবি করেছিলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত একটি মামলার আসামি সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তার বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন।

সম্রাট রোবায়েতের অভিযোগ অনুযায়ী, ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্তে একাধিক সাক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্তে চট্টগ্রামের ঘটনার বিষয়ে ৫৫ জনেরও বেশি সাক্ষী সরাসরি ফারাজ করিমের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপরও বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাকে গ্রেপ্তারি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছিল, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো. মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালান। অভিযোগে পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়; বলা হয়, ফারাজ করিমের মায়ের সঙ্গে তাজুল ইসলামের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা এবং আইজি প্রিজনের ভাষ্যমতে তার অসুস্থতা মৌসুমি বা ‘সিজনাল’ হওয়া সত্ত্বেও তাকে জামিন দেয়ার জন্য একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।

তবে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এসব দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগগুলোকে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দেন। অভিযোগে নাম আসা অন্য প্রসিকিউটররাও নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।

এদিকে অভিযোগ দায়েরের মাত্র দুই সপ্তাহ পর, গত ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অনাপত্তিপত্র দাখিল করেন সম্রাট রোবায়েত। এতে তিনি পূর্বের অভিযোগের বিষয়ে আপত্তি না থাকার কথা জানান, যা ঘটনাটিকে নতুন মোড় দেয়। কেন তিনি অবস্থান পরিবর্তন করলেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

সম্রাট রোবায়েতের এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, অভিযোগ দায়েরের পেছনের উদ্দেশ্য এবং পুরো বিষয়টির রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বিষয়টি পরিষ্কার করতে হলে ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

ঘটনাটি এখন শুধু একটি অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া, প্রসিকিউশন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।