চাউর হয়েছে ভারতের সঙ্গে বিগত দেড় বছরের ভঙ্গুর সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় আনতে ৪৮ ঘণ্টার এক “ট্রানজিট সফরে” ভারতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। একদিনের কিছু আনুষ্ঠানিক বৈঠক থাকলেও ভারতের তিনি অবস্থান করবেন প্রায় ৩দিন!
জ্বালানি সহায়তা, ভারতের পর্যটন ভিসা চালু, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাণিজ্য সম্পর্কিত ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি মিটিং নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসব মিটিং ও দু‘দেশের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে দুই দেশের সম্পর্ক। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ছিল ‘স্বামী-স্ত্রী’র মত। সেখান থেকে ভারতের এক তরফা সম্পর্কের পরিবর্তে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের দিকে যাবে কিনা, সেই কানাঘুষা কূটনীতি পাড়ায়।
প্রতিক্রিয়াটি মিশ্র। কেউ কেউ মনে করছেন, খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে; অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওবায়দুল হকের মতে, ইরান-ইসরাইল-মার্কিন যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটসহ বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপুঞ্জ নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত বিশ্ব-ব্যবস্থা।
তিনি বলেছেন, ‘পরিচিত ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ ভেঙে পড়ছে বা রূপান্তরিত হচ্ছে। সম্পর্কগুলো আরও বেশি লেনদেন নির্ভর হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, লাতিন আমেরিকা, আর্কটিক অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া সব জায়গায় নতুন শক্তির ভারসাম্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। সহযোগী দেশগুলোর বেশিরভাগই বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। বিদ্যমান সহযোগিতা চালু থাকবে এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি হবে।
২০১৪ সালের নির্বাচন অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না। ওই নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো সুরাহা না করেই একপক্ষীয় স্বার্থে ট্রানজিট চুক্তি, বন্দর ব্যবহার এবং আদানি বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত চুক্তির মতো বিষয়গুলোতে ভারসাম্যহীনতা জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তোলে। এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের নিরঙ্কুশ সমর্থনও বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক মূলধনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতন হয়। ফলশ্রুতিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধারণানুযায়ীই দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়৷ বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টা সিদ্ধান্ত নেবার মত মোড়লগিড়ি মানসিকতাও দেখায় ভারত।
সে অবস্থা ভুলে সামনে এগোনোর তাড়না দেখা যাচ্ছে ভারতের মধ্যে। নতুন সরকারকে দ্রুততম সময়ে অভিনন্দন জানানো, শপথ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো ও নানা কাজে বিএনপি সরকারের পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে মোদী সরকার। বিএনপির একাধিক মন্ত্রীও ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কথা বলেছেন।
সেই ধারাতেই বেইজিং বা মস্কোকে উপেক্ষা করে ওয়াশিংটন ও দিল্লিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পরিপন্থী হলেও, এটি আঞ্চলিক বাস্তবতা ও কৌশলগত স্বার্থকে সামনে রেখে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার।
এর আগে আমেরিকা থেকে নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ চীন-রাশিয়ামুখী হতে চাইলেও মূলত ভারতের কারণেই পারেনি। আবার আমেরিকা তাদের বেশ কিছু নীতি ভারতের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, দিল্লি নিজের স্বার্থ আগে দেখায় শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি ওয়াশিংটন। ফলে বাংলাদেশকে মূলত ভারত কেন্দ্রিক করে ফেলেন শেখ হাসিনা।
যদিও দিল্লি থেকে নিজের কোনো স্বার্থ আদায় করতে না পারায়, শেষ মুহূর্তে মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে নজর দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী সরকার। কিন্তু রাশিয়ায় সফর বা চীন সফর, কোনোটাই পূর্ণ করতে পারেন নি পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরের নির্ধারিত আলোচ্য-সূচী নিয়ে আলোচনা শেষ না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
২০১৪ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয় বাংলাদেশের। আর একচেটিয়ে সুবিধাভোগী কূটনৈতিক বন্ধু হয় ভারত। গণঅভ্যুত্থানের পর ইউনূস সরকারের মাধ্যমে আমেরিকার সাথে টানাপোড়েনেরে ইতি ঘটে। আমেরিকার সুদৃষ্টি পেতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেখে দিয়েছে বিএনপি সরকার।
যদিও আগামীতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীন সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছে। একই সাথে এ মাসের শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও চীন সফর করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবুও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফরে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা সেই পতিত আওয়ামীলীগের সরকারের রেখে যাওয়া নীতি থেকেই শুরু হচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারত। বিশ্বের বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন ভারতের মাধ্যমে। সেই হিসাবে নতুন সরকারের ভারত সফরের মাধ্যমেও এটিই প্রমাণ করেন সেই থেকেই শুরু করছেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল একাধিকবার চীন সফর করায়, বাংলাদেশের রাজনীতি উঠতি পরাশক্তি চীনমুখী হবার সম্বাবনা দেখছিলেন অনেকে। কিন্তু সরকার গঠনের পর বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে সরকারের কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি। বরং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিকসহ নানা লেনদেন ও সফর দেখা গেছে যা অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তরুণদের মধ্যে।
নতুন একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি কী হবে বিএনপি সরকারের? পতিত স্বৈরাচার সরকারের রেখে যাওয়া নীতি থেকে নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ভঙ্গুর সম্পর্ক থেকেই নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন।
ইরান যুদ্ধ বিশ্ব পরিস্থিতি ও ভূরাজনীতিকে নতুন মাত্রায় ভাবতে বাধ্য করছে। নতুন সমীকরণ ও মেরুকরণ শুরু হয়েছে। ফলে বিদ্যমান ও উদীয়মান পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। নানা দেশে দানা বাধছে জেন-জি আন্দোলন। ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সংঘাত এ অঞ্চলে জন্ম দিয়েছে নতুন অস্থিরতার। তাই সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের স্বার্থ রক্ষা করার কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে বাংলাদেশ।
এ প্রেক্ষিতে দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সাথে বৈঠক করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এছাড়াও ভারতের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়াও একই বিমানে লম্বা সময় ধরে মরিশাস সফরে যাবেন দু‘দেশের মন্ত্রী। কূটনীতিকদের ভাষায় এই সফর যতটা না আনুষ্ঠানিক আলোচনার তার চেয়ে বেশি দুদেশের অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে আগামীর সম্পর্কের গতিপথ বোঝার চেষ্টা করা হবে। আপাতত কোনো ফলাফল বা চুক্তি না হলেও এ সফর থেকে আগামীর সম্পর্কের একটি রূপরেখা পাওয়া যেতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র দিল্লি-মুখী কূটনীতি দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। তাই একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও মস্কো-বেইজিংয়ের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ ছাড়া স্থায়ী কোনও বন্ধু বা শত্রু হয়না। সেই নীতিতে ধরেই এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। স্বাধীন ও আত্ম-মর্যাদাবোধ সম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ করা নিজস্ব স্বার্থ, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সামনে রেখেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিশোধের রাজনীতি বা বিচ্ছিন্নতার নীতি নয়, বরং এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যেখানে আত্মমর্যাদা, পারস্পারিক সম্মান এবং পারস্পারিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!