গোলাপি শহর ঐতিহ্যবাহী জয়পুর
গোলাপি শহর ঐতিহ্যবাহী জয়পুর।   ছবি: সংগৃহীত

হরের রং ভারতের পিংক সিটি নামে খ্যাত জয়পুর শহরটিকে প্রথম দেখায় মনে হয় যেন রঙের ভেতর দিয়ে হাঁটা হচ্ছে। ভোরের নরম আলোয় কিংবা বিকেলের রোদে গোলাপি দেয়ালগুলো আলাদা আলাদা আবহ তৈরি করে, কখনো উষ্ণ, কখনো নরম, কখনো আবার রাজকীয় গাম্ভীর্যে ভরা। জয়পুর কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি এক ধরনের আবেগ, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনধারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শহরের ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এই গোলাপি রং নিছক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এটি সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি পরিচয়, যা শহরকে ভারতের অন্য সব নগর থেকে আলাদা করে তুলেছে।

জয়পুর শহরের জন্ম হয়েছিল পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে, যা সেই সময়ের ভারতীয় নগর ইতিহাসে ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। ১৭২৭ সালে কচ্ছওয়া রাজবংশের শাসক মহারাজা সাওয়াই জয় সিংহ দ্বিতীয় নতুন রাজধানী হিসেবে এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানমনস্ক ও দূরদর্শী শাসক, জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যে গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। দিল্লির অতিরিক্ত জনসংখ্যা, রাজনৈতিক চাপ ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে নতুন শহরের কথা ভাবতে বাধ্য করে। তিনি এমন একটি নগর চেয়েছিলেন, যেখানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা থাকবে, বাণিজ্য সহজ হবে এবং নাগরিক জীবন হবে সুশৃঙ্খল। প্রাচীন ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র ও শিল্পশাস্ত্রের নীতিমালা অনুসরণ করে তিনি গ্রিড প্যাটার্নে পরিকল্পিত শহর নির্মাণ করেন, যেখানে প্রশস্ত সড়ক, নির্দিষ্ট বাজার এলাকা এবং আবাসিক ও রাজকীয় অংশের সুস্পষ্ট বিভাজন ছিল।

এই পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যেই জয়পুর ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে রাজপ্রাসাদ, দুর্গ, বাজার ও আবাসিক অঞ্চল গড়ে ওঠে। আমের ফোর্ট, সিটি প্যালেস কিংবা হাওয়া মহলের মতো স্থাপনাগুলো কেবল স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং রাজপুত শাসনব্যবস্থার শক্তি, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। শহরের প্রতিটি ভবন, প্রতিটি রাস্তা যেন পরিকল্পনার ভাষায় কথা বলে, যেখানে বিশৃঙ্খলার বদলে শৃঙ্খলা আর হঠাৎতার বদলে ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।

জয়পুরকে গোলাপি রঙের শহর হিসেবে পরিচিত করার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলসের ভারত সফর উপলক্ষে জয়পুর শহরকে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজস্থানের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস অনুযায়ী গোলাপি রং আতিথেয়তা ও সৌজন্যের প্রতীক, তাই পুরো পুরোনো শহরের ভবনগুলো এই রঙে রাঙানো হয়। এই উদ্যোগটি ছিল রাজকীয় সম্মান প্রদর্শনের অংশ, কিন্তু এর প্রভাব স্থায়ী হয়ে যায়। পরবর্তীতে শহরের ঐতিহ্য ও পরিচয় রক্ষার্থে গোলাপি রং বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আজও পুরোনো জয়পুরে ভবনের বহিরাংশ গোলাপি রাখার নিয়ম কার্যকর রয়েছে।

এই গোলাপি রং শহরকে দিয়েছে এক অনন্য নান্দনিক ঐক্য। যখন কেউ জয়পুরের পুরোনো শহরে হাঁটে, তখন মনে হয় প্রতিটি ভবন যেন একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে। খিলানযুক্ত বারান্দা, সূক্ষ্ম নকশার জানালা, দীর্ঘ সারিবদ্ধ ভবন—সব মিলিয়ে শহরটি একটি চলমান শিল্পকর্মের মতো মনে হয়। সকাল, দুপুর আর সন্ধ্যায় এই রং ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা নেয়, যা শহরের সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তোলে।

জয়পুর শহরের বর্ণনায় বাজারগুলোর কথা না বললেই নয়। জোহরি বাজার, বাপু বাজার কিংবা ত্রিপোলিয়া বাজারে হাঁটলে শহরের প্রাণ স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। এখানে গয়না, রঙিন কাপড়, হস্তশিল্প আর ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর ভিড়ে বাণিজ্য ও সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে। দোকানিদের ডাক, ক্রেতাদের দরকষাকষি, রঙিন পণ্যের ঝলক—সব মিলিয়ে বাজারগুলো জয়পুরের সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

এই শহরের মানুষ জয়পুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। এখানকার মানুষ সাধারণত অতিথিপরায়ণ, শান্ত স্বভাবের এবং নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত। পুরুষদের রঙিন পাগড়ি ও নারীদের ঘাঘরা-চোলিতে রাজস্থানের মরুভূমির ইতিহাস ও জীবনসংগ্রামের ছাপ স্পষ্ট। তারা উৎসবপ্রিয়, সংগীত ও নৃত্যের প্রতি অনুরাগী এবং সামাজিক বন্ধনে বিশ্বাসী। জয়পুরের মানুষ আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেও ঐতিহ্যকে ছেড়ে দেয়নি; বরং পুরোনো ও নতুনের সহাবস্থানেই তারা নিজেদের জীবনধারা গড়ে তুলেছে।

শহরের দৈনন্দিন জীবনে উৎসব ও আনন্দের বড় ভূমিকা রয়েছে। তিজ, গঙ্গৌর, দীপাবলির মতো উৎসবগুলোতে পুরো শহর রঙিন হয়ে ওঠে। ঘরবাড়ি সাজানো হয়, মানুষ নতুন পোশাক পরে, গান-বাজনা আর নাচে মেতে ওঠে। এই উৎসবগুলো শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। একই সঙ্গে জয়পুরের খাদ্যসংস্কৃতিও শহরের পরিচয়ের অংশ। দাল বাটি চুরমা, ঘেওয়ার কিংবা বিভিন্ন মশলাদার রাজস্থানি খাবার শহরের স্বাদকে আলাদা মাত্রা দেয়।

আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জয়পুরেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন রাস্তা, হোটেল, পর্যটন কেন্দ্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার শহরকে আধুনিক করেছে। তবু এই আধুনিকতার ভিড়েও জয়পুর তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে। গোলাপি রং, পরিকল্পিত নগর কাঠামো ও সাংস্কৃতিক চর্চা শহরটিকে তার নিজস্ব পরিচয়ে টিকিয়ে রেখেছে। এখানে ইতিহাস কোনো জাদুঘরে বন্দি নয়, বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, জয়পুর শুধু একটি শহর নয়, এটি এক দীর্ঘ সময়ের গল্প। গোলাপি রং এখানে কেবল ভবনের গায়ে নয়, মানুষের আচরণ, সংস্কৃতি ও স্মৃতিতে ছড়িয়ে আছে। রাজকীয় অতীত, পরিকল্পিত বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ—এই তিনের সমন্বয়েই জয়পুর আজও পিংক সিটি নামে পরিচিত। এই শহর আমাদের শেখায়, একটি নগর কীভাবে তার রং, ইতিহাস ও মানুষকে একসঙ্গে ধরে রেখে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেকে জীবন্ত রাখতে পারে।