কৃষ্ন নন্দী, জামায়াতে ইসলামী, নির্বাচন
নির্বাচনী প্রচারণায় দলের পতাকা হাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান   ছবি: সংগৃহীত

আমার নাম কৃষ্ণ নন্দী। আমি একজন হিন্দু। আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীও বটে। অনেক পাঠকের কাছে এই সংমিশ্রণটি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। আমার কাছে, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গভীর সত্যের প্রতিফলন যা দীর্ঘকাল ধরে ভয়, ভুল তথ্য এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল।

আমার মনোনয়ন জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে—একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আমি এই বিতর্ককে স্বাগত জানাই। আমার প্রার্থিতার অস্তিত্বই মূলত এই ধারণাটিকে সরাসরি এবং প্রকাশ্যে মোকাবিলা করার জন্য।

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যা আমি আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষদের বারবার বলেছি। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসলে কোনো হিন্দুকে বাংলাদেশ ছাড়তে হবে না। কোনো হিন্দুকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। বরং, হিন্দুরা এই দেশে মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সম্মানের সাথে বসবাস করবে। আমি যখন বলি হিন্দুরা সম্মানের সাথে বিবেচিত হবে, তখন আমি রূপক অর্থে কথা বলছি না। আমি আইনের অধীনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সমান নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তার কথা বলছি।

কয়েক দশক ধরে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়ের বীজ রোপণ করা হয়েছে। হিন্দুদের বলা হয়েছে যে ইসলামী রাজনীতি মানেই তাদের ওপর নির্যাতন। এই আখ্যানটি কারো কারো জন্য রাজনৈতিকভাবে উপকারী হলেও জাতীয় ঐক্যের জন্য গভীরভাবে ক্ষতিকর। আমার মনোনয়ন নিজেই এই দাবির একটি জীবন্ত প্রতিবাদ, এবং এটি ইতিমধ্যেই তাদের অনেকের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে—যারা রাজনীতির ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।

আমি ২০০৩ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছিলাম, কোনো সুবিধা লাভের আশায় নয় বরং বিশ্বাস থেকে। আমি দলের মধ্যে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক স্বচ্ছতা পেয়েছি। জামায়াত টাকা দিয়ে ভোট কেনে না। এটি ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি বা সহিংসতার ওপর নির্ভর করে না। এগুলি কেবল মুখের বুলি নয়। এগুলি এমন নীতি যা দলের অভ্যন্তরে কঠোরভাবে পালন করা হয়। একারণেই সংখ্যালঘুসহ অনেক সাধারণ নাগরিক এখন তাদের রাজনৈতিক পছন্দ পুনর্বিবেচনা করছেন।

মানুষ প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। এর মধ্যে এমন দলগুলোও রয়েছে যারা একসময় গণতন্ত্রের কথা বললেও ধীরে ধীরে দুর্নীতি, সহিংসতা এবং দায়মুক্তিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। নাগরিকরা কেবল কোনো কিছুর বিপক্ষে ভোট দিচ্ছেন না। তারা এমন একটি বিকল্প খুঁজছেন যা ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের বিষয়ে আন্তরিক।

জামায়াতকে ক্রমশ সেই বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমার নির্বাচনী এলাকা খুলনা-১-এ মানুষ বছরের পর বছর ধরে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ভয়ের কারণে কষ্ট পেয়েছে। বিশেষ করে হিন্দুরা লক্ষ্যবস্তু হয়ে হামলা, বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়েছে। অনেকে অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়েছেন। পরিবারগুলো ক্রমাগত চাপের মধ্যে বসবাস করেছে। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি যে, এই অবিচারগুলো উপেক্ষা করা হবে না। যাদের অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে— তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাবেন। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ভীতি প্রদর্শন সহ্য করা হবে না।

আমি দালাল-ভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কাজ করি না। আমার ফোন নম্বর জনগণের কাছে আছে এবং থাকবেই। প্রতিনিধিত্ব হওয়া উচিত সরাসরি, জবাবদিহিমূলক এবং ধারাবাহিক—এমন কিছু নয়, যা কেবল নির্বাচনের মৌসুমে সক্রিয় হয়।

আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন, তারা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। আমার জবাব ছিল দৃঢ়। আমাকে চুপ করানো যাবে না এবং আমাকে একপাশে ঠেলে দেওয়া যাবে না। আমাদের রাজনীতিতে ভয় দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। আমরা যদি এর কাছে নতি স্বীকার করি, তবে কিছুই বদলাবে না।

আরেকটি বিষয় যা সততার দাবি রাখে তা হলো ইতিহাস। আমি অস্বীকার করি না যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে নিগৃহীত হয়েছে। সেই দুর্ভোগ কেবল মুখের কথায় মুছে ফেলা যায় না। আসল বিষয় হলো, কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন অবিচারকে অস্বীকার করার পরিবর্তে তার মোকাবিলা করতে ইচ্ছুক কিনা।

জামায়াতে ইসলামীতে আমার উপস্থিতি—ইতিহাস নতুন করে লেখার কোনো প্রচেষ্টা নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা। অনেকে প্রশ্ন করেন, জামায়াত কি কেবল মুসলমানদের জন্য? আমার উত্তর সোজাসাপ্টা। জামায়াত মূল্যবোধের দিক থেকে একটি ইসলামী দল কিন্তু দায়িত্বের দিক থেকে একটি জাতীয় দল। ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানুষের মর্যাদা কোনো একটি ধর্মের নিজস্ব সম্পত্তি নয়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের সময় স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেকে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেছিলেন। তবে, জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের সদস্যরাই তখন আমাদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন এবং আমাদের মন্দির ও উপাসনালয়গুলো পাহারা দিয়েছিলেন।

স্লোগান দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রের চেয়ে ন্যায়বিচার দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের ভালো সুরক্ষা দেয়। যখন পরিবারগুলো দারিদ্রে পতিত হয়, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কল্যাণ নেটওয়ার্কগুলো ধর্ম বা রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পর্কে প্রশ্ন না করেই তাদের পাশে দাঁড়ায়। সেবার এই সংস্কৃতিই ব্যাখ্যা করে কেন অনেক নাগরিক জামায়াতকে স্লোগানের দল হিসেবে নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো এবং দায়িত্বশীলতার দল হিসেবে দেখেন।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্যও আমি সমানভাবে স্পষ্ট হতে চাই। এই নির্বাচন কোনো মতাদর্শ আমদানি বা ভয় রফতানি করার বিষয় নয়। এটি নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের বিষয়। বাংলাদেশ বাস্তবতাবেই একটি বহুত্ববাদী সমাজ, কারো দয়ায় নয়। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি এই সত্যকে উপেক্ষা করলে তারা টেকসইভাবে শাসন করতে পারবে না। আমার প্রার্থিতা কেবল একটি আসন জেতার জন্য নয়, এটি বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক আলাপচারিতা শুরু করার জন্যও। এমন একটি আলোচনা যা ভয়ের ঊর্ধ্বে, সাম্প্রদায়িক সন্দেহের ঊর্ধ্বে এবং এই ধারণার ঊর্ধ্বে যে পরিচয়ই আমাদের বিভক্ত করবে।

আমি একজন হিন্দু প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছি, জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করে নয়, বরং আমি বিশ্বাস করি যে এর নীতিগুলো সবার জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গড়তে সাহায্য করতে পারে। এই দেশ আমাদের সবার।

সূত্র : আল জাজিরা 

আরটিএনএন/এআই