২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পাঁচ দিন পর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তাঁর সঙ্গে শপথ নিয়েছেন ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভাও।
এই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন নুরুল হক নুর এবং জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (যিনি জোনায়েদ সাকি নামেই অধিক পরিচিত)। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই দুই নেতা প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া নুর এবং জনপ্রিয় বামপন্থী নেতা সাকি—কেউই বিএনপির সরাসরি সদস্য নন। উল্লেখ্য, বিএনপি দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফিরেছে। প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে ১৭ বছরের স্বেচ্ছা-নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে মঙ্গলবার দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
নুরুল হক নুর কে?
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পটুয়াখালীর এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা নুর বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৩৪ বছর বয়সী নুর ‘গণঅধিকার পরিষদ’ দল থেকে বিএনপির সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী হিসেবে নিজের আসনে জয়লাভ করেন।
তিনি প্রথম জাতীয়ভাবে নজরে আসেন ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা হিসেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে, যেখানে তিনি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন।
সেসময় সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে সারা বাংলাদেশের ছাত্র-যুবরা আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ওই সময় লোভনীয় সরকারি চাকরির অর্ধেকেরও বেশি বিভিন্ন কোটার ভিত্তিতে সংরক্ষিত ছিল। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের সমর্থকদের পুরস্কৃত করতে এই কোটা পদ্ধতি ব্যবহার করছে।
হাসিনা সরকার ২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে আদালত কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলে আবারও বিক্ষোভ দানা বাঁধে। এটি দ্রুতই হাসিনার "স্বৈরাচারী" শাসনের পতনের এক বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ ছিল।
নুর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এই অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন। তিনি অধিকার-ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ‘গণঅধিকার পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ-চালিত ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। যদিও দলটি প্রায়ই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙনের কবলে পড়েছে। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে সংস্কার ও শাসন নীতির প্রশ্নে নুর বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের কাছাকাছি আসেন।
জোনায়েদ সাকি কে?
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করা জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতা হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন সাকি। ৫২ বছর বয়সী এই নেতা ১৯৯৮ সালে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন’-এর সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাকি ২০০০-এর দশকের শেষদিকে গঠিত প্রগতিশীল দল ‘গণসংহতি আন্দোলন’-এর প্রধান সমন্বয়ক। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী নেতা। তিনি ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি ঢাকার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন কিন্তু জিততে পারেননি। তবে এবার তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে ৫৫,০০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনে জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে সাকি বলেন, "স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সব দলকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।" তিনি সমর্থনের জন্য বিএনপি নেতাদের ধন্যবাদ জানান।
তাদের কেন মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হলো?
নতুন সংসদের মতো, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভারও রাষ্ট্র পরিচালনার খুব একটা অভিজ্ঞতা নেই। নুর ও সাকিসহ তার সকল প্রতিমন্ত্রীই প্রথমবারের মতো এই দায়িত্ব পেয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাকি ও নুরের নিয়োগ অপ্রত্যাশিত নয় এবং এটি মূলত জোট সঙ্গীদের প্রতি বিএনপির প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, “তারা দুজনই এমন দলের প্রতিনিধিত্ব করেন যারা বিএনপির জোটসঙ্গী ছিল। এটি মূলত জোট সঙ্গীদের পুরস্কৃত করারই একটি অংশ।” একই সঙ্গে শাহান আল জাজিরাকে বলেন, এই দুই নেতাই "জুলাই [২০২৪] অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং বিগত হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে।" তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় তাদের নিয়োগ "জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের অবদানের স্বীকৃতি।"
প্রতিমন্ত্রী হওয়ার কারণে নুর ও সাকি আগামী দিনগুলোতে তাদের নির্ধারিত মন্ত্রণালয়ে সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। শাহান বলেন, "বিএনপির নেতাদের তালিকা বেশ শক্তিশালী। নুর বা সাকিকে পূর্ণ মন্ত্রিত্ব দেওয়ার অর্থ হলো দলের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে বাদ দেওয়া। তারেক রহমানকে এখানে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে।"
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের কী হলো?
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) রক্ষণশীল দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করেছিল। তবে নিজেদের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি দলটি। এনসিপি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জয়ী হয়েছে। দলটির নেতা ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়ে নতুন সংসদের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ এমপি হয়েছেন। এখন তারা জামায়াতের সঙ্গে বিরোধী দলের আসনে বসবে, যা উভয়ের জন্যই একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!